আপসযোগ্য একটি মামলায় রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বৃদ্ধ আমির উদ্দিনের এক বছরের সাজা হয়। তবে সাজা হলেও বাইরে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। কারণ অপরাধ ও বয়স বিবেচনায় আদালত তাকে কারাগারে না পাঠিয়ে বাড়িতে থেকে সংশোধনের সুযোগ দিয়েছে।
আমির উদ্দিন বলেন, ভুল-ত্রুটি সংশোধনের জন্য আদালত আমাকে সুযোগ দিয়েছে। বাড়িতে থেকে আমি স্বাক্ষর করা শিখেছি। আদালতের চেষ্টায় বয়স্ক-ভাতাও পাচ্ছি। এ জন্য আমি বিচারব্যবস্থা ও সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ।
জানা গেছে, রাজশাহী আদালত থেকে এমন সাজাপ্রাপ্ত অন্তত ২৩ আসামিকে কারাগারে যেতে হচ্ছে না। ছোটখাটো অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে সংশোধনের মাধ্যমে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ‘প্রবেশন’ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাড়িতে থাকার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কিছু শর্তসাপেক্ষে বাড়িতেই তারা সাজা খাটছেন। ‘দ্য প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৬০’ অনুযায়ী এমন সুবিধা পাচ্ছেন তারা।
বিচারকরা আসামি সম্পর্কে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তার প্রাক-প্রতিবেদন পেয়ে এমন রায় দিয়েছেন। এতে আদালতের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত আসামিরা সংশ্লিষ্ট সমাজকল্যাণ অফিসের একজন প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে থাকবেন। তবে বাড়িতে থাকা অবস্থায় শর্ত ভাঙলে যেতে হবে জেলে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অধ্যাদেশটি অনেক পুরোনো হলেও বাংলাদেশে প্রয়োগ ছিল না বললেই চলে। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এক নির্দেশনায় অধস্তন আদালতের বিচারকদের অধ্যাদেশটি অনুসরণের নির্দেশ দেন। এর পর থেকে এর দৃশ্যমান প্রয়োগ শুরু হয়।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবেশনের ফলে নিজেকে সংশোধন ও অপরাধপ্রবণতা থেকে নিবৃত্ত করতে আসামিরা উত্সাহী হবে। বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে দ্বিগুণের বেশি বন্দি, যাদের বেশির ভাগই মাদক মামলার আসামি। লঘুদণ্ডে অনেকেই কারাগারে গিয়ে দাগি আসামির সংস্পর্শে ভবিষ্যতে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। প্রবেশনের ফলে এ প্রবণতা রোধ করা যাবে। এ ধরনের রায় বিচারাঙ্গনের মামলাজট নিরসনেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেও তারা মনে করেন।
রাজশাহী আদালতের আইনজীবী শামীম আহমেদ বলেন, প্রথম ও লঘু অপরাধের ক্ষেত্রে প্রবেশন খুব ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। এর মাধ্যমে আসামিরা নিজেদের সংশোধনের চমত্কার সুযোগ পাচ্ছেন। আদালতের নির্ধারিত সময়ে তারা প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে থাকেন। এর ফলে একদিকে মামলার জট কমবে এবং আমাদের কারাগারগুলোতে আসামিদের চাপও কমবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হাসিবুল আলম প্রধান বলেন, দেশের আদালতগুলোতে প্রবেশনের চর্চা ব্যাপক হারে হওয়া উচিত। পাশাপাশি এ আইনের কিছু সংশোধনীরও দরকার আছে। প্রবেশন বিষয়টির সঙ্গে প্রবেশন কর্মকর্তার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আরো প্রবেশন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া দরকার। এছাড়া তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরো দক্ষ করে তুলতে হবে।
রাজশাহীর প্রবেশন কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, আসামি সম্পর্কে আদালতে আমরা একটি প্রাক-প্রতিবেদন পাঠাই। প্রতিবেদনে এটি তার প্রথম অপরাধ কি না, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা, প্রতিবেশীরা তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করে এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়। আদালতে প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত দেন।
