ইংরেজিতে ‘ব্ল্যাক সোয়ান’ তথা ‘কালো রাজহাঁস’ লইয়া একটি তত্ত্ব চালু আছে। এই ব্যাপারে প্রাচীন একটি মতবাদ রহিয়াছে যে, কালো রাজহাঁসের কোনো অস্তিত্ব নাই। তাই কোনো মতবাদকে যদি কোনো একটি পক্ষ উড়াইয়া দিতে চাহে, তখন বলা হইয়া থাকে—ইহা একটি কালো রাজহাঁসতুল্য ভাবনা। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকে কেহ কেহ কালো রাজহাঁসের সহিত তুলনা করিয়া থাকেন। ইহার মধ্যে সর্বাগ্রে রহিয়াছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ট্রাম্পের ঠিক উলটা কথা বলিয়াছিলেন। ওবামার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীকে আশু বিপর্যয় হইতে রক্ষা করিতে হইলে আগামীকাল নহে, আজই সমগ্র বিশ্বের নেতৃবৃন্দের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে।
ওবামার ‘আজ’ অনেক পূর্বেই পার হইয়া ‘আগামীকাল’ও গত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু এখনো বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসারণের প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী জি-২০ তালিকাভুক্ত দেশসমূহ। এই ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি লেখা সম্প্রতি দ্য গার্ডিয়ান প্রকাশ করিয়াছে। সেইখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শুরুতেই বলিয়াছেন যে, গত মাসে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ ডুবিয়া গিয়াছিল; এক দশকের রেকর্ড ভঙ্গকারী ভারী বর্ষণ এখনো অব্যাহত; ১৫ লক্ষের অধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত; ১০ হাজার হেক্টর ধানের জমি পানির নিচে তলাইয়া গিয়াছে। আমরা ইতিপূর্বে বলিয়াছি যে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন একটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতির দিকে লইয়া যাইতেছে এই মানবসভ্যতাকে। ইহার বিবিধ নিদর্শন এখন ঘনঘন দেখা যাইতেছে। বিশ্বব্যাপী আমরা দেখিতে পাইতেছি তুষারপাত, শীত ও গরমের চরম অবস্থা, বিস্তীর্ণ ও প্রলম্বিত বন্যা, বিধ্বংসী দাবানলের ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব। গত বত্সর অস্ট্রেলিয়ার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভস্মীভূত হইয়া গিয়াছিল। পৃথিবীর ফুসফুসখ্যাত আমাজনে দাবানল যেন ছেলেখেলায় পরিণত হইয়াছে। আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের দাবানাল যেন নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হইয়াছে। বিশেষজ্ঞরা একমত যে, অরণ্য ধ্বংস এবং প্রাণিজগত্ ও মানুষের মধ্যে ব্যবধানটি ক্রমশ সংকুচিত হইবার ফলেই প্রাণীদের রোগ স্থানান্তরিত হইতেছে মানুষের দেহে, যাহার পরিণতিতে বৈশ্বিক মহামারি এখন নিষ্ঠুর বাস্তবতা।
জলবায়ু পরিবর্তনের যেই বাস্তবতা, তাহার পক্ষের বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন—পৃথিবীতে বরফ যুগ, উষ্ণ যুগ, বিবিধ প্রাকৃতিক পরিবর্তন অযুত-লক্ষ-নিযুত বত্সর ধরিয়া ঘটিয়া আসিতেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তন হইয়াছে অতি ধীরে ধীরে, হাজার হাজার বত্সর ধরিয়া। অন্যদিকে সতেরো শতকে শিল্পবিপ্লবের পর মাত্র কয়েক শতকেই পৃথিবীর তাপমাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়াছে। ইহার কারণ জলবায়ুর পরিবর্তন। এই পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবে ঘটিতে হাজার হাজার বত্সর সময় লাগিত। এখন প্রশ্ন হইল, শিল্পবিপ্লবকে কি শাটডাউন করা সম্ভব? বলা যায়, আধুনিক অতি উন্নত জীবনযাপন ও সভ্যতার যাবতীয় বৈশিষ্ট্য গড়িয়া উঠিয়াছে শিল্পবিপ্লবের হাত ধরিয়াই। সুতরাং চাহিলেই শিল্পকারখানার লাগাম টানিয়া ধরা যায় না। তাহা হইলে বাস্তব উপায় কী—তাহা নির্ণয় ও বাস্তবায়নের উপরই মানবসভ্যতার ভবিষ্যত্ নির্ভর করিতেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মতো আমরাও মনে করি, জলবায়ু পরিবর্তন, চলমান কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইহার অর্থনৈতিক অভিঘাত বিশ্বকে নূতন দৃষ্টি দান করিয়াছে; বিশ্বনেতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা ভীষণভাবে স্পষ্ট হইয়াছে। বিশ্বের একটি বৃহত্ অংশকে এই বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে রাখিয়া কোনো দেশই ভালো থাকিবে না। ইহা এক অর্থে আমাদের সামষ্টিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নও বটে।
