অযোগ্যদের নিয়ে বিড়ম্বনা

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:২৫

আমাদের সমাজে একটি প্রবচন প্রচলিত আছে যে ‘না বুঝে ছিলাম ভালো, আধাবোঝা কাল হলো’। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আমরা যে যেখানে যে অবস্থানেই আছি বা থাকি না কেন, সবার যেন একটাই মতলব, একটাই লক্ষ্য : কোনোভাবে বাউলি কেটে তাল্টিবাল্টি করে সময়-ক্ষেপণ; দিন অতিবাহিত করে যাওয়া। নিজের বা নিজেদের ঘাটতি-অপূর্ণতা, নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য-ত্রুটিবিচ্যুতি আমরা পারতপক্ষে কেউ স্বীকার করি না, স্বীকার করতে চাই না। দায়িত্ব পালনে ব্যক্তি, মহল বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা-উদাসিনতা-অদক্ষতা-খামখেয়ালিপনা বা স্বার্থপরতার কারণে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ দুর্ভোগ-বিড়ম্বনা ও ভোগান্তির শিকার হলেও এখানে যেন কারো কিছু যায় আসে না। ভাগ্যবিড়ম্বিত ব্যক্তিদের দুর্ভোগ-বিড়ম্বনা ও ভোগান্তি বা মনোযন্ত্রণার কাহিনি এবং কর্তাব্যক্তিদের অজ্ঞতা-অযোগ্যতা-অদক্ষতা-অবহেলা ও খামখেয়ালিপনার বিষয় কখনো সচেতন কেউ বা কোনো মহল জনস্বার্থে সর্বসমক্ষে তুলে ধরতে চাইলে বা তুলে ধরতে সচেষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, মহল তথা কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে হয় নীরব থাকেন, নয় তো নানা ছলছুতোয় নিজেদের দোষত্রুটি ঢাকবার জন্য, আনীত অভিযোগ খণ্ডন করবার জন্য কখনো কখনো মনগড়া যুক্তির অবতারণা, এমনকি অসত্যাচারের আশ্রয় গ্রহণ করতেও কুণ্ঠা বা দ্বিধাবোধ করেন না। অজ্ঞতা-অযোগ্যতা-অদক্ষতা-হূদয়হীনতা—এমনসব কারণই থাকতে পারে এসবকিছুর পেছনে।

পণ্ডিতপ্রবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তার রচনাসমূহে প্রসঙ্গক্রমে এমন একটি সংস্কৃত বাক্য অনেকবার ব্যবহার করেছেন—‘অগাধজলসঞ্চারী বিকারী নচ রোহিতঃ গণ্ডুষজলমাত্রেন শফরী ফরফরায়তে।’—অর্থাত্ রুইমাছ অগাধ জলে বিহার করে, অথচ তার বিকার নেই। পুঁঠিমাছ গণ্ডুষমাত্র জলে ফরফর করে বেড়ায়।

‘অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী। বিদ্যার অমৃত হয় অকুণ্ঠ পান কর, নয়তো কর না।’ —ইংরেজ কবি আলেকজান্ডার পোপের (১৬৮৮-১৭৪৪) কাব্য ‘An Essay on Criticism’ থেকে উদ্ধৃত এই বাক্যটি। পুরো কথাটা এই রকম—A little learning is a dangerous thing; Drink deep, or taste not the pierian springs. সম্পূর্ণ আলো অথবা সম্পূর্ণ অন্ধকার ভালো। কারণ আলো-আঁধারে পথ চলতে গেলে সমূহ বিপদ; পড়ে গিয়ে হাত-পা ভেঙে যেতে পারে। ...

আমরা যে যেভাবেই বলি না কেন—যোগ্যতা, জ্ঞান আর অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকলে তা অন্য কোনোকিছু দিয়ে পূরণ করা যায় না।

অযোগ্য ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো আসনে বসানো হলে ভোগান্তির আর শেষ নেই। এবং তা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তখন সংশ্লিষ্ট সবার আরো বেশি বিড়ম্বনা। হতে পারেন তিনি কোনো রাজা-উজির, উপদেষ্টা-পারিষদ, দপ্তরপ্রধান, স্বনামখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, কলেজের অধ্যক্ষ, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি, জিএম বা ম্যানেজার কিংবা উচ্চাসনে আসীন আমলা— কম বেশি সবার ক্ষেত্রেই কথাটি প্রযোজ্য। আর অযোগ্যতার সঙ্গে যদি অসততা যোগ হয় তাহলে তো কোনো কথাই নেই। এক্ষেত্রে ভালো বা কল্যাণকর কিছু আশাই করা যায় না। তবে অযোগ্যের চেয়ে অসত্ খানিকটা হলেও ভালো। অসেক কোনোভাবে সহজেই ম্যানেজ করে তবুও কোনোরকমে কাজটি সম্পন্ন করিয়ে ফেলা যেতে পারে; কিন্তু অযোগ্যের দ্বারা? যিনি বোঝেনই না তিনি কীভাবে কার কী কাজে লাগবেন!—সার্বক্ষণিক কারণে ও অকারণে অধস্তন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে খিটখিটে মেজাজ ও ‘খালি পায়ের ধমক দেখানো’ ছাড়া তার আর কাজ কী! কাজ আরো একটি আছে, তা হলো—তোয়াজ-তোষামোদি করা। সবকিছু, সবাইকে— বিশেষ করে যে করেই হোক খুঁটিটিকে ঠিক রাখতে হবে। আমার এ বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করার অবকাশ হয়তো রয়েছে। তবে তা বোধ করি একেবারে অস্বীকার করা যাবে না। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। তবে ব্যতিক্রম কম আর বেশি নিয়মের অস্তিত্বকেই প্রমাণ করে।

সবচেয়ে মারাত্মক এবং সবার জন্যই চরম দুর্ভাগ্যজনক হলো যে—এসব পদ বা আসনে অধিষ্ঠিত থাকা ব্যক্তিদের যার যার অধীন বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তর বা প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব বা ব্যক্তিগত সম্পদ-সম্পত্তি বলে মনে করার বিষয়টি। অবস্থা-অবস্থান, পরিবেশ-পরিস্থিতি, এমনকি নিজের সম্পর্কেও সঠিক ধারণাটি না থাকলে যা হয়!

মিথ্যা বলা অযোগ্যদের কাছে খুবই মামুলি ব্যাপার। এমন গুরুত্বপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত থেকে যারা মিথ্যা কথা বলেন, বলতে পারেন তারা সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই যে কী বিপজ্জনক ও দুঃসহ বিড়ম্বনার কারণ হতে পারেন কেবল ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বোধ করি তা উপলব্ধি করতে পারবেন না। ফলে কেবল উপরের স্তরের নয়, সংশ্লিষ্ট একদম নিচের স্তরের কর্মচারীদের পর্যন্ত আত্মসম্মান হারানোর ভয়ে তটস্থ থাকতে হয়। ‘বস’, সরাসরি বস তিনি; তার ব্যাপারে কিছু বলাও যাবে না। কারণ ‘এ টু জেড’—সবারই জানা আছে কিংবা সবাই উপলব্ধি করতে পারেন যে, তিনি কিছু না কিছুর জোরেই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠা পেয়েছেন।

অযোগ্য ব্যক্তিরা নানা কৌশল অবলম্বন করে কিংবা বাউলি কেটে কেটে কোনো রকমে হয়তো কাজ চালিয়ে যেতে পারেন; কিন্তু তা ব্যাপক অর্থে বিপুল জনগোষ্ঠীর কোনোই কাজে আসে না, বরং ক্ষতির কারণ দাঁড়ায়।

n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক