মনীষী

আজো বিদ্যাসাগর

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৪৯

বাবার সঙ্গে বীরসিংহ গ্রাম থেকে কলকাতার পথে মাইলস্টোনের সংখ্যা দেখে গুনতে শেখা আর মায়ের ডাকে ঝড়ের রাতে উত্তাল দামোদর নদী সাঁতরে পাড়ি দেওয়া—সেসব গল্প গেঁথে আছে হূদয়ে। তারপর বিদ্যাসাগরের জীবনী, নানা বীরত্বের কাহিনিতে তাঁকে পেয়েছি অখণ্ডরূপে।

তিনি যেমন আমাদের মর্মমূলে রয়ে গেছেন, তেমনি বহুরূপে ঈশ্বরচন্দ্রকে খুঁজে পাই তাঁর করুণার সাগর হওয়ার হদিসে। আর ‘বিদ্যাসাগর’ এই প্রতিষ্ঠানিক উপাধি কীভাবে একজন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একাত্ম হতে পারে, তার উদাহরণ ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও তিনি নামের পাশে ‘শর্স্মা’ বা ‘শর্ম্নণঃ’ লিখতেন।

উনিশ শতকী বাংলায় জন্মেছিলেন অসামান্য পুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র। এ বছরই তাঁর দ্বিশত বার্ষিকী উদ্যাপন। তিনি দ্রোহী ছিলেন—পিতৃকুলের ধর্ম, সমাজ, আচার-আচরণের বিরুদ্ধে। সমকালীন জনারণ্যে তিনি ছিলেন একা এবং চিরএকা। সম্বল ছিল অদম্য আকাঙ্ক্ষা আর দুঃসাহস। আঘাত হানলেন ধর্মের দুর্গে, সমাজ ও সংস্কারের দেয়ালে। আঘাত হানলেন সেই বিশ্বাস ও বন্ধনে যা জীবনকে করে তোলে জড় পদার্থ।

তবে ঈশ্বরচন্দ্রের ধর্ম?

শ্রেয়োবোধই ছিল তাঁর ধর্ম। তিনি জীবনবাদী, মানবতাব্রতী, মুক্তপুরুষ। স্বকালে বিদ্যাসাগরের সাফল্য ছিল সামান্য—এতে তাঁর অক্ষমতা দায়ী নয়, দায়ী জনসমাজে শিক্ষার অভাব।

প্রায় দুই পুরুষ ধরে আর্থিক অসচ্ছলতা জীবনের পরিপন্থি, এমনকি পিতৃশাসনও স্বৈরাচারী—এমনই এক বামুন পরিবারে জন্ম বিদ্যাসাগরের। জন্মেই শুনতে হয়েছে পিতামহের মুখে—‘এঁড়ে বাছুর জন্মেছে।’ ভগবানে ভক্তি ছিল না, কিন্তু পিতা-মাতাকে ভক্তি করেছেন দেবতাজ্ঞানে।

তাঁকে উপলব্ধি করার বিশেষ কেউ ছিল না। কিন্তু তাঁকে দমিয়ে রাখার ক্ষমতাও তেমন কারো ছিল না। আহ্বানে কে-ই বা সাড়া দেয় যতক্ষণ না আর্তচিত্কার মর্মে গিয়ে ছেদ করে? প্রজ্ঞায়, সংকল্পে, দৃঢ়তায় তিনি সমাজকে পথ চিনিয়েছিলেন। হিতবাদী দর্শনেই ছিল তাঁর আস্থা। কেবল গণমন প্রভাবিত করার জন্যই শাস্ত্র আওড়িয়েছিলেন। শৈশব থেকেই বিদ্যাসাগর নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবান হয়ে ওঠেন।

বীরসিংহের সিংহশিশু বিদ্যাসাগর (১৮২৯-১৮৯১) তাঁর জীবনে যে বিপুল কর্মযজ্ঞ করে গেছেন—একালের বাঙালির পক্ষে তা অপরিসীম। বাংলা গদ্যে শৃঙ্খলা আনা থেকে শুরু করে শিক্ষকতা, সমাজ সংস্কার, মুক্তচিন্তার প্রচার-প্রসার, বিধবাবিবাহ ও নারীশিক্ষার প্রচলন এবং স্বনির্ভর করে তোলা, বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক অভিশাপ দূর করা—তাঁর গোটা জীবনের বহুধা ব্যাপ্ত ব্যক্তিত্বের পরিচয়ের সবটুকুই উঠে এসে সমুদ্রগামী নদীর মতো বিদ্যাসাগরে গিয়ে মেলে। এ উপাধি পেয়েছিলেন তিনি ১৮৩৯-এ সংস্কৃত কলেজে পড়ার সময় হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষায় সাফল্যের মাধ্যমে। তবে কি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরেই বিলীন হয়ে পড়েন?

উনিশ শতকে তাঁকে নিয়ে গান বাঁধা হয়েছিল। শান্তিপুরের তাঁতিদের কাপড়ে বিদ্যাসাগরের নাম উঠে এসেছে। একপলক দেখার জন্য উদগ্রীব জনতা রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে থেকেছে। তাঁকে দেখে নিরাশ হয়েছে, ছোটখাটো মানুষটি মোটেই দৃষ্টিনন্দনযোগ্য ছিলেন না। একখানি কাপড় ফেঁড়ে একখণ্ড পরতেন আর একখণ্ড গায়ে দিতেন। পায়ে থাকত দেশি মুচির শুঁড়তোলা চটিজুতো।

স্বেচ্ছায় পারিবারিক জীবন থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্রমশ আত্মীয়-পরিজনহীন নিঃসঙ্গতার মধ্যেও আজীবন ছিলেন মানুষের সঙ্গে। শেষ জীবনটা কেটেছিল কার্মাটাঁড় এলাকার আদিবাসীদের হোমিওপ্যাথি চিকিত্সা করে—তাদের কাছে জীবনদাতা ঈশ্বর হয়ে উঠেছিলেন বিদ্যাসাগর।