বেলারুশ সীমান্তে উত্তেজনা

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৫২

সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র বেলারুশের সাম্প্রতিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেখানকার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কিছুটা জটিল আকার ধারণ করেছে। উল্লেখ্য, গত ৯ আগস্ট অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষমতাসীন ভিক্তর লুকাশেঙ্ক দীর্ঘদিন ধরে বেলারুশের ক্ষমতা কেন্দ্রে থাকা লুকাশেঙ্কু বরাবরই অন্যান্য পূর্ব ইউরোপীয় দেশের মতো রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন। সংগত কারণেই আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে অনেকটা অপাঙেক্তয় বেলারুশ সরকার। এতত্সত্ত্বেও বেলারুশ আমেরিকা সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে চলতি বছরের শুরুতে। সে অর্থে গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মিনস্ক সফর ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কেননা মাইক পম্পেও এর ঐ সফর সম্পন্ন হওয়ার অল্প কিছু দিনের পরেই রুশ-বেলারুশ সম্পর্কের ছন্দপতনের বিভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যার সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে—নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে ৩৩ জন রুশ নাগরিককে গ্রেফতার করে বেলারুশের নিরাপত্তা বাহিনী। এই নিয়ে আচমকা দ্বন্দ্ব্বে জড়ায় করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সফল দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে থাকা বেলারুশ ও রাশিয়া। ঘটনার জেরে মস্কোয় নিযুক্ত বেলারুশীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করে নিজ নাগরিকদের গ্রেফতারের কারণ জানতে চায় রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যদিও শেষ পর্যন্ত এই জটিলতা বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। এ ধরনের ভিন্ন পরিস্থিতি সত্ত্বেও বিজয়ী প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কুর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে ক্রেমলিন। অবশ্য এর আগেই বেলারুশের আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষিত প্রার্থী ভেলেরি তেসেপকায়া আশ্রয় নেন মস্কোতে। এদিকে নির্বাচনোত্তর বেলারুশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও রাশিয়ার পথ ধরে আরো কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ বিশেষত হাঙ্গেরি, মলদোভা প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লুকাশেঙ্কর গ্রহণযোগ্যতার ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। একই সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ে নির্বাচনি অনিয়মসংক্রান্ত বিরোধীদের দাবি। কিন্তু নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একজন পরাজিত প্রার্থী লিথুনিয়ায় আশ্রয় নিয়ে জনগণকে রাস্তায় নামার নির্দেশ দেন। পশ্চিমাপন্থি এই নেতার ঐ নির্দেশ এবং তত্পরবর্তী তার বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতির জের ধরে লোকজন রাস্তায় নামে। এই সুযোগে লুকাশেঙ্কর বিরোধীরা সেখানে আন্দোলনের ডাক দিলে বেলারুশ পরিস্থিতির সহসা অবনতি ঘটে। তবে এখন পর্যন্ত বেলারুশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কর নিয়ন্ত্রণেই আছে। কিন্তু লিথুনিয়ায় আশ্রয় নেওয়া পশ্চিমাপন্থি তিকান ভোসকায়ার ভূমিকা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। কেননা তিনি অনেকটা লুকিয়ে বেলারুশ থেকে লিথুনিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যদিকে বাল্টিক অঞ্চলে ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বেলারুশের পশ্চিম সীমান্তের দেশ লিথুনিয়ার সঙ্গে মস্কো কিংবা মিনস্ক কারোরই সম্পর্ক ভালো নয়। বলা চলে, বেলারুশের সঙ্গে লিথুনিয়ার সম্পর্ক অনেকটাই শত্রুভাবাপন্ন। এক্ষেত্রে রুশ-পশ্চিমা সমীকরণের প্রভাব এখানে স্পষ্টভাবে ক্রিয়াশীল। যে কারণে ন্যাটো সদস্য লিথুনিয়ায় অবস্থান নেওয়া তিকান ভোসকায়ার আচরণ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। এই সূত্র ধরে বেলারুশের অভ্যন্তরীণ উত্তাপের রেশ ছড়াচ্ছে আঞ্চলিক পর্যায়ে। ইতিমধ্যে বেলারুশের অভ্যন্তরীণ অবনতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এই অঞ্চলে সৈন্য বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে ন্যাটো ও আমেরিকা। এক্ষেত্রে নিজ মিত্রদের নিরাপত্তা সুসংহত করার অঙ্গীকার থেকেই ন্যাটো এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন ঐ সামরিক জোটের সেক্রেটারি জেনারেল। ন্যাটোর এই সৈন্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে বাড়িয়ে দেবে সামরিক উত্তাপ। এতে করে পূর্ব ইউরোপীয় অঞ্চলে ন্যাটোর সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে সংক্ষুব্ধ রাশিয়ার আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকছে। এমনটি হলে ভুগতে হবে ইউক্রেন, লিথুনিয়া এস্তোনিয়াকে। ইতিমধ্যে রাশিয়ার সমর্থন পেয়ে সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোর সংগঠন কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্টস স্টেটস বা সিআইএসের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বেলারুশ ইউক্রেন ও লিথুনিয়া সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছেন। একই সঙ্গে বেলারুশের সেনাবাহিনী সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় বিভিন্ন ধরনের মহড়া চালাচ্ছে, যা স্পষ্টত সামরিক সংঘাতের পদধ্বনি। এ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে বেলারুশ ঘিরে সামগ্রিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে?

বেলারুশের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র রাশিয়া নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে এ কথা মানতে নারাজ। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই ল্যাভরভ এ ব্যাপারে অত্যন্ত খোলামেলাভাবেই কথা বলেছেন গণমাধ্যমে। তিনি লিথুনিয়ায় নির্বাসিত কাভাস্কায়াকে ইঙ্গিত করে বলেন যে, বিরোধীরা বেলারুশে রক্তপাত চাইছে। অন্যদিকে পশ্চিমারা বেলারুশের বিরোধীদের আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছে, এমন অভিযোগ শুধু মিনস্ক কর্তৃপক্ষের নয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনেও এর সত্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—তাহলে কি বেলারুশকে কেন্দ্র করে নতুন এক ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে পরাশক্তিগুলো? এই পরিপ্রেক্ষিতে লাভক্ষতির হিসেব কষতে প্রথমেই আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। কেননা স্নায়ুযুদ্ধ উত্তর যুগে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতির সমন্বিত লক্ষ্যই ছিল একপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি মজবুত করা। এই নীতি বাস্তবায়ন করতে পশ্চিমারা বিশ্বকে স্পষ্টত বিভক্ত করে ফেলে। এতে করে নিষ্পেষণের শিকার হয় অনেক দেশ। তথাপি আমেরিকার নেতৃত্বাধীন একপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার বিপক্ষে থাকা গুটিকয়েক দেশ রাশিয়া ও চীনের সমর্থন নিয়ে জাতীয় শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রাখতে সচেষ্ট থাকে। এক্ষেত্রে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় কিউবা, ভেনিজুয়েলা, ইরান, সিরিয়া, উত্তর কোরিয়া ও বেলারুশের নাম। এ কথা আর কারোরই অজানা নয় যে, ৯০ সালের পর থেকেই উল্লিখিত দেশগুলোর প্রতি নানা মাত্রার নিপীড়নমূলক নীতি গ্রহণ করে আমেরিকা ও পশ্চিমারা। বেলারুশ এর বাইরে নয়। ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বেলারুশের প্রায় ৭৫ এলাকাই শহরাঞ্চল। অথচ এই দেশটির সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের ব্যবসায়-বাণিজ্য বিনিয়োগ অত্যন্ত নগণ্য। উলটো দেশটির সঙ্গে রাশিয়ার রয়েছে ঐতিহাসিক সম্পর্ক। বেলারুশের মোট বাণিজ্যের ৫০ শতাংশের বেশি অংশীদার হচ্ছে মস্কো। অন্যদিকে স্থানীয় বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য অংশই রাশিয়ার। একই সঙ্গে মস্কো ও মিনস্কের মধ্যে রয়েছে নিবিড় রাজনৈতিক যোগাযোগ। ইতিমধ্যে দেশ দুইটি ইউনিয়ন স্টেট চুক্তির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো জোরালো করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই বাস্তবতায় সেখানকার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে পশ্চিমাদের ইন্ধনের ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণভাবে আলোচিত হচ্ছে। মূলত বেলারুশের ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে লুকাশেঙ্ককে যে কোনো মূল্যে সরিয়ে দিয়ে সেখানে নিজেদের পছন্দমতো লোকদের রাজনৈতিক ক্ষমতায় নিয়ে আসতে চায় কোনো কোনো দেশ। যেমনটি ইউক্রেন কিংবা অল্পকালীন সময়ের জন্য জর্জিয়ায় সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বেলারুশের পরিস্থিতি ভিন্ন। এছাড়াও গত এক দশকে বিশ্বব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এই পরিবর্তনের সূত্র ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক ক্ষমতা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু তাদের সামরিক সক্ষমতার ব্যাপারটি এখনো বিদ্যমান। কিন্তু নিরঙ্কুশ নয়। পক্ষান্তরে একপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ধারা ইতিমধ্যে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। মূলত রাশিয়া ও চীনের নেতৃত্বাধীন এই শক্তিবলয়ের দুর্গটি দুর্বল করতে বেলারুশে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে মরিয়া পশ্চিমা বিশ্ব। কিন্তু লুকাশেঙ্ক রাশিয়ার সমর্থন পাওয়ায় পশ্চিমাদের সে আশা আপাতত ভেস্তে গেছে। কিন্তু ঝামেলায় পড়তে হয়েছে মিনস্ক ও মস্কোকে। গত এক দশক ধরেই আমেরিকা বিভিন্ন অজুহাত তুলে এই অঞ্চলে ন্যাটোর শক্তি বৃদ্ধি করে কার্যত রাশিয়াকে চেপে ধরতে চাইছে। বেলারুশের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে লিথুনিয়ায় আমেরিকার ও ন্যাটোর সৈন্য ও সরঞ্জাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি সেরকই একটি প্রক্রিয়া। এতে করে বেলারুশ সীমান্তের কৌশলগত এলাকায় সামরিক সমীকরণে এগিয়ে থেকে রাশিয়াকে চেপে ধরে আঞ্চলিক পরিসরে নিজের স্বার্থ হাসিল করাই মূল লক্ষ তাদের। বেলারুশের সর্বশেষ পরিস্থিতি সেরকমই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে ইউক্রেন, লিথুনিয়া সীমান্তে যে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তার পরিণতি হতে পারে যুদ্ধ, যে যুদ্ধে সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোকে জড়াতে পারলে তা আমেরিকার জন্য সুফল নিয়ে আসবে। বেলারুশকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা এমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

n লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক