যৌতুকের অভিশাপ থেকে মুক্তি চাই

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৫৩

আমরা প্রতিদিন পত্রপত্রিকায়, ফেসবুকে যৌতুকের বলির খবর পেয়ে থাকি। বর্তমানে যৌতুকপ্রথা যেভাবে সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিচ্ছে তার কোনো প্রতিকার দেখছি না। দেশে অনেক সামাজিক সংগঠন রয়েছে, যেগুলো সামাজিক অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার, সেগুলোকে দেখি না যৌতুকের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে। বর্তমানে সারা দেশে যৌতুকপ্রথা প্রচলিত থাকলেও বিশেষ করে চট্টগ্রামে যৌতুকপ্রথার বিভিন্ন ধরন রয়েছে, যা নাকি ধাপে ধাপে উসুল করা হয়। এ ধরনের প্রথাগুলো এক জন কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে সর্বস্বান্ত করে দেয়। পাঠকদের অবগতির জন্য ধাপগুলো উল্লেখ করছি। প্রথমে পাত্রপাত্রী উভয় পক্ষ বিয়ের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছালে উভয় পক্ষ মিলে ফর্দ করে। এতে উভয় পক্ষের মুরব্বি শ্রেণির লোকেরা থাকেন। এই ফর্দ অনুষ্ঠান মেয়ের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে মেয়ের বাবাকে আগত অতিথিদেরকে ভালোভাবে আপ্যায়ন করতে হয়। ফর্দ অনুষ্ঠানের পর আসে এনগেজমেন্ট অনুষ্ঠান অর্থাত্ পানচিনি অনুষ্ঠান। এখানেও মেয়ের বাবাকে আগত অতিথিদেরকে উন্নত খাবার দিয়ে আপ্যায়িত করতে হয়। এনগেজমেন্টের পর আসে আক্দ অনুষ্ঠান। আক্দ অনুষ্ঠানের দিন আকেদর পর নির্ধারিতসংখ্যক অতিথিদের মেয়ের বাড়িতে আমন্ত্রণ করা হয় এবং অতিথিদেরকে এখানেও ভালো খাবার দিয়ে আপ্যায়িত করতে হয়। আকেদর পর আসে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান। গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদেরকে আপ্যায়িত করতে হয়। বিয়ের দিন ছেলের পক্ষ থেকে বিপুলসংখ্যক অতিথি মেয়ের বাড়ি অথবা নির্ধারিত ক্লাব অথবা কমিউনিটি সেন্টারে আসেন। বিয়ের দিন মেয়ের বাবাকে বিশালসংখ্যক অতিথিকে উন্নতমানের খাবার দিয়ে আপ্যায়িত করতে হয়। বিয়ের পর ছেলে তার বন্ধুদের নিয়ে মেয়ের বাড়িতে আসে। যাকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় চোরা বৈরাত বলা হয়। এখানেও মেয়ের বাবাকে অতিথিদের জন্য খাবারের আয়োজন করতে হয়। শুধু তাই নয়, ছেলের ছোট ভাইবোন এবং বোন জামাইদেরকে স্বর্ণের আংটি অথবা টাকা দিতে হয়। বিয়ের বাজার করার সময় ছেলের মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, ভাবিদের জন্য মেয়ের বাবাকে কাপড়চোপড় কিনতে হয়। এখানেই শেষ নয়, বিয়ের কয়েক দিন পর মেয়ের বাবাকে তার বেয়াই মানে ছেলের বাবাকে দাওয়াত করে খাওয়াতে হয়। এখানেও খাওয়া-দাওয়ার বিশাল আয়োজন করতে হয়। বিয়ের পর শুরু হয় মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে বিভিন্ন খাবার-দাবার পাঠানো প্রক্রিয়া। যেমন রোজার সময় মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ইফতারসামগ্রী পাঠাতে হয়। ঈদ উপলক্ষ্যে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকদেরকে কাপড়চোপড় পাঠাতে হয়।

রোজার ঈদের পর আসে কোরবানির ঈদ। কোরবানির ঈদ উপলক্ষ্যে মেয়ের বাড়ি থেকে ছেলের বাড়িতে গরু অথবা ছাগল পাঠাতে হবে, সঙ্গে ময়মসলা পাঠাতে হয়। কোরবানির ঈদের পর আসে মহরম। মহরম উপলক্ষ্যে ছেলের বাড়িতে রান্না করা খাবার-দাবার পাঠাতে হয়। তাছাড়া ফলের মৌসুমে মেয়ের বাবাকে ছেলের বাড়িতে আম, কাঁঠাল, লিচু, আনারসসহ বিভিন্ন ধরনের ফল পাঠাতে হয়। তালের দিনে তাল পিঠা। শীতের সময় শীত পিঠা পাঠাতে হয়। ছেলেমেয়ের সংসারে সন্তান জন্ম নিলে মেয়ের বাবাকে আবারও গরু-ছাগল পাঠাতে হয়। এভাবে চলছে চট্টগ্রামে যৌতুক কালচার। দেশের অন্যান্য স্থানে যৌতুকপ্রথা বিদ্যমান থাকলেও চট্টগ্রামের মতো এত প্রকট নয়। আমরা যারা চট্টগ্রামের বাসিন্দা, তারা প্রায়ই এসব ঘটনা দেখছি। চট্টগ্রামের কালচারের সঙ্গে এসব প্রথা একাত্ম হয়ে গেছে। যদি কোনোক্রমে এর ব্যতিক্রম ঘটে, তবে শ্বশুরবাড়িতে মেয়ের ওপর নেমে আসবে অমানুষিক নির্যাতন। চট্টগ্রামে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতারা কত অসহায় অবস্থায় আছেন তার বাস্তব চিত্র হয়তো বা দেশের কর্তাব্যক্তিরা জানেন না। চট্টগ্রামের যৌতুকপ্রথা বন্ধের ব্যাপারে বিভিন্ন সংগঠন মাঝে মধ্যে সোচ্চার হয়ে উঠলেও তা সফল হয় না বিভিন্ন কারণে। সামাজিক জরিপে দেখা গেছে, টাকার অভাবে অনেক কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা তার মেয়েকে বিয়ে দিতে পারছেন না। আবার অনেকে মেয়ের বিয়ের জন্য বিত্তবানদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। গরিব পরিবারের মেয়েদের বিয়ে না হওয়ায় মেয়েদের বয়স বেড়ে যাচ্ছে। এভাবে একদিন তাদের বিয়ের বয়স পার হয়ে যাবে। আমাদের সমাজ থেকে যৌতুকপ্রথা বন্ধের ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিয়ের ব্যাপারে সরকারিভাবে কঠোর আইন জারি করতে হবে। যাতে কেউ কোনো যৌতুক দাবি করতে না পারে।

দেশের সর্বস্তরের মানুষ যদি যৌতুকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় তবে আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস সমাজ থেকে যৌতুকের অভিশাপ চিরতরে দূর হয়ে যাবে। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাদের তাদের কন্যা সন্তান নিয়ে কোনো টেনশন করতে হবে না। এ ব্যাপারে দেশের জনগণের পাশাপাশি সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। আমরা আগামী দিনে যৌতুকবিহীন সমাজের অপেক্ষায় থাকলাম।

n লেখক :বিমা কর্মকর্তা