ফিরেছে মাছের সুদিন

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:৪৫

মাছে ভাতে বাঙালি—নদীমাতৃক বাংলাদেশের চিরাচরিত প্রবাদ। এ দেশের অসংখ্য নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, ডোবা-নালায় ঐতিহাসিকভাবেই পাওয়া যায় নানা রং ও স্বাদের মাছ। তবে কয়েক দশক আগে যেসব দেশি মাছ হারিয়ে গিয়েছিল এখন আবার তা ফিরতে শুরু করেছে। বাড়ছে উত্পাদনও। মাছের সুদিন ফিরে এসেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ এখন মাছ উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশের বিজ্ঞানীদের গবেষণায় নতুন নতুন জাতের মাছ চাষ যেমন এগিয়ে গেছে, তেমনি হারিয়ে যাওয়া পুরোনো মাছও আবার ফিরে এসেছে। সেসব মাছ মিলছে দেশের নদী, বিলে। এছাড়া চাষও করা হচ্ছে সেসব মাছের। আর সে কারণেই অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মত্স্য আহরণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। আর চাষকৃত মাছ উত্পাদনে বিশ্বে পঞ্চম। তেলাপিয়া উত্পাদনে চতুর্থ আর ইলিশ উত্পাদনে বাংলাদেশ শীর্ষে তা তো সবার জানা। দেখা গেছে, ৩৫ বছরের ব্যবধানে মাছের উত্পাদন বেড়েছে সাড়ে পাঁচ গুণের বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের মোট উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৫ লাখ ৫২ হাজার মেট্রিক টন।              এদিকে গেল সপ্তাহেই জাতীয় অর্থনৈতিক কমিটি-একনেক অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধিতে ২০২ কোটি ৪ লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন মত্স্য অধিদপ্তর ২০২০ থেকে জুন ২০২৪ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছের উত্পাদন ও উত্পাদনশীলতা ২০১৭-১৮ এর উত্পাদন ৩ লাখ ৮৩ হাজার মেট্রিক টন হতে ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৪ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় যেমন নদী, সুন্দরবন, কাপ্তাই লেক, বিল ও প্লাবনভূমির পরিমাণ প্রায় ৩৯ লাখ ২৭ হাজার হেক্টর। বদ্ধ জলাশয় পুকুর, মৌসুমি চাষকৃত জলাশয়, বাঁওড় ও চিংড়ি ঘের, পেন কালচার ও খাঁচায় মাছ চাষের আওতাধীন জলাশয়ের পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৯৮ হাজার হেক্টর। সামুদ্রিক জলাশয়ের পরিমাণ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার এবং সমুদ্র উপকূল ৭১০ কিলোমিটার। দেখা যাচ্ছে, উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের উত্পাদন গত ৩৫ বছরে বহুলাংশে কমেছে। ১৯৮৩-৮৪ সালে উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের আহরণ প্রায় সাড়ে ৬২ শতাংশ হলেও ২০১৭-১৮ সালে তা এসে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ২৮ শতাংশে। এর বিপরীতে বদ্ধ জলাশয়ে মাছ আহরণের পরিমাণ সাড়ে তিন গুণ বেড়ে হয়েছে সোয়া ৫৬ শতাংশ। এই মাছ উত্পাদন বাড়ার পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রম। দেশে স্বাদুপানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ৬৪ প্রজাতির মাছ বর্তমানে বিপন্ন প্রায়। এখন আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে সেসব দেশি মাছ। পুকুরসহ বদ্ধ জলাশয়গুলোকে বিজ্ঞানভিত্তিক মাছ চাষের আওতায় আনার ফলে বেড়েছে উত্পাদন। এর পাশাপাশি বেশ কিছু বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজনন ও চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ফলে দিন দিন বিলুপ্তপ্রায় মাছের উত্পাদন বাড়ছে।

এদিকে মত্স্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, দেশে উত্পাদন বেড়ে যাওয়ায় মাছ আমদানি কমে আসছে।  ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায় ৮৮ হাজার টন মাছ আমদানি করা হয়। এর পরের বছর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা নেমে দাঁড়ায় ৭৮ হাজার টনে। দেশে প্রতি বছর যত মাছ আমদানি হচ্ছে, তার একটি বড় অংশই হলো সামুদ্রিক মাছ। মত্স্য অধিদপ্তর বলছে, এই মাছের মধ্যে রয়েছে মাগুর, শিং জাতীয় মাছ, রূপচাঁদা, সেড বা গিজার্ড সেড, সার্ডিন প্রভৃতি।

মত্স্য অধিদপ্তর জানায়, ময়মনসিংহ, বগুড়া, নওগাঁ, কুমিল্লাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় পুকুরে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে ঘেরে মাছের চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে। বিপন্ন প্রায় মাছের প্রজাতির সংরক্ষণ, অবাধ প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে ৫৩৪টি মত্স্য অভয়াশ্রম স্থাপন করা হয়েছে। অভয়াশ্রম-সংশ্লিষ্ট জলাশয়ে মাছের উত্পাদন ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি হয়েছে। অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার ফলে বিলুপ্তপ্রায় এবং বিপন্ন ও দুর্লভ প্রজাতির মাছ, যথা একঠোঁট, টেরিপুঁটি, মেনি, রানী, গোড়া গুতুম, চিতল, ফলি, বামোস, কালিবাউশ, আইড়, টেংরা, সরপুঁটি, মধু পাবদা, রিঠা, কাজলি, চাকা, গজার, বাইম ইত্যাদির তাত্পর্যপূর্ণ পুনরাবির্ভাব ও প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অভয়াশ্রমে দেশি কই, শিং, মাগুর, পাবদা ইত্যাদি মাছের পোনা ছাড়ার ফলে এসব মাছের উত্পাদন বেড়েছে। সেইসঙ্গে দাম কমে নাগালের মধ্যে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, আমাদের ৪৭ লাখ হেক্টর মিঠাপানির অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের মধ্যে ৩৯ লাখ হেক্টর রয়েছে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় আর ৮ লাখ হেক্টর অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়। গবেষণার মাধ্যমে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই ৮ লাখ হেক্টর জলাশয় থেকে দেশের মোট মাছ উত্পাদনের ৫৭ শতাংশ আসে। আর উন্মুক্ত জলাশয় থেকে আসে ২৭ শতাংশ। তিনি বলেন, আমাদের মাছ উত্পাদন বাড়াতে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় এবং বিস্তৃত সমুদ্রকে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় আনতে পারলে মাছের উত্পাদন বহু গুণ বাড়ানো সম্ভব হবে।

ইয়াহিয়া মাহমুদ আরো জানান, দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক গবেষণায় ২৩ প্রজাতির মাছের পোনা উত্পাদন এবং চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবনে সাফল্য পেয়েছেন গবেষকরা। এগুলো হচ্ছে পাবদা, গুলশা, গুজিআইড়, রাজপুঁটি, চিতল, মেনি, টেংরা, ফলি, বালাচাটা, শিং, মহাশোল, গুতুম, মাগুর, বেড়ালী, কুঁচিয়া, ভাগনা, খলিশা, কালিবাউশ, কই, বাটা, গজার, সরপুঁটি ও গণি মাছ। এছাড়া উন্মুক্ত জলাশয় থেকে যে মাছগুলো বিলুপ্ত হতে চলেছে সেগুলো সংরক্ষণ করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উত্পাদনের পর জলাশয়ে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করার গবেষণা করছেন তারা। এছাড়া ঢেলা, শালবাইন, কাকিলা ও আঙ্গুস ভোল মাছের প্রজনন ও চাষাবাদপদ্ধতি নিয়েও গবেষণা চলছে।

বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে মাঠ পর্যায়েও এই মাছের পোনা বিতরণ করা হয়েছে। যা বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকহারে চাষ হচ্ছে। চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবনের ফলে বাণিজ্যিকভাবে এসব মাছ চাষ করা যাচ্ছে। এতে মাছের প্রজাতি ফিরে আসার পাশাপাশি উত্পাদন বেড়ে লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। ফলে এই খাতে বিনিয়োগও বাড়ছে।