বিন্দু রাগ করে পাপড়ভাজার পেট আনতে না যাওয়ায় চন্দ্রা উঠে গিয়ে নিয়ে আসল। আনজুম বিন্দুকে কাছে টেনে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। বললেন— দাঁড়াও এখনি সালামের গল্প শুরু করছি।
না লাগবে না— গাল ফুলিয়ে বিন্দু বলল।
আনজুম বিন্দুর গাল টিপে দিয়ে বললেন— ওরে আমার সোনারে, রাগ করে ফেলেছে। ড. সালাম ছিলেন একজন বড় পদার্থবিজ্ঞানী। তাঁর জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং মজার ঘটনা ঘটেছে।
মজার ঘটনার কথা শুনে বিন্দু আনজুমের মুখের দিকে তাকাল। আনজুম হেসে বললেন— ড. আব্দুস সালামের জন্ম ১৯২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি। তিনি পাঞ্জাবের ঝং শহরে এবং লাহোর সরকারি কলেজে পড়াশুনা করেন ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত।
বিন্দুর মন ভালো হতে শুরু করেছে। সে বলল— তিনি কি কলেজ থেকেই লেখাপড়া শুরু করেছেন, স্কুলে পড়েননি ?
বিন্দুর কথায় সবাই হেসে উঠল। আনজুম বললেন— স্কুলে তো অবশ্যই পড়েছেন এবং স্কুলের মজার ঘটনাও আছে। ছয় বছর বয়সে সালামকে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য নেওয়া হলো। প্রধান শিক্ষক সাহেব তাঁর সাথে কথা বলেই বুঝতে পারলেন, একে উঁচু ক্লাসে ভর্তি করা যাবে। সরাসরি সালামকে ক্লাস ফোরে ভর্তি করে দিলেন।
ওয়ান টু থ্রি না পড়ে সরাসরি ক্লাস ফোরে ভর্তি করানোতে সবাই অবাক হলো। বিন্দু বলেই ফেলল— ক্লাস ফোর, লেজ তুলে দৌড়।
আকাশ বলল— সরাসরি ক্লাস ফোরের পড়া সালাম চালিয়ে নিতে পারলেন?
হ্যাঁ, ফার্স্ট হয়েই সালাম ফাইভে উঠে গেলেন। এরপর প্রভিন্সের সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে ম্যাট্রিক পাশ করলেন সালাম। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষাতেও ফার্স্ট, লাহোরে এসে কলেজে ভর্তি হলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি লাহোর সরকারি কলেজের ছাত্র হিসেবে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর চলে এলেন কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে বিশিষ্ট জ্যোতিঃপদার্থবিদ ফ্রেড হয়েল ছিলেন তাঁর টিচার। তিনি সালামকে পরীক্ষা নির্ভর বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করতে পরামর্শ দিলেন। কারণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে পরীক্ষা বিষয়েও ধারণা থাকা প্রয়োজন।
১৯৪৬-৪৯ সালে সালাম পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতে ডাবল অনার্স কোর্স কমপিট করেন এবং গণিত বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে Wrangler হবার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেন।
Wrangler মানে ? বলল অণু।
Wrangler হলো ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিষয়ে অনার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি প্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীদের সম্মানসূচক উপাধি।
রেখা বলল— অনার্স ডিগ্রি লাভের পর কী করলেন সালাম?
এরপর ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ওপর গবেষণা শুরু করেন এবং ১৯৪৬ সালে দেশে চলে আসেন।
গবেষণা বাদ দিয়ে ? বলল রেখা।
না না, বাদ দিয়ে নয়। গবেষণাও করেন আবার লাহোর সরকারি কলেজ এবং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান পদে দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৫২ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এর মধ্যে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানে আহমদিয়া সমপ্রদায় ও মুসলিমদের মধ্যে বিরোধ চরমে ওঠে। আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে আন্দোলন চলতে থাকে। প্রফেসর সালাম ছিলেন আহমদিয়া সমপ্রদায়ের মানুষ। এই নিয়ে তাঁর কোনো সংশয় ছিল না। কিন্তু একদিন তিনি হতবাক হয়ে শুনলেন, তিনিও আক্রান্ত হতে পারেন।
কেন ? এত বড় বিজ্ঞানীকেও আক্রমণ ? বললেন কমলা।
হ্যাঁ, সামপ্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মানুষজন তো এরকমই। তারা তো বিবেক বিবেচনা বহির্ভূত কাজ করে।
তখন ড. সালাম কী করলেন ? বলল চন্দ্রা।
তিনি পরিবার পরিজনসহ ১৯৫৪ সালে ক্যামব্রিজে চলে গেলেন এবং স্টোক্স অধ্যাপক পদে যোগ দিলেন। পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজে অধ্যাপক পদে যোগদান করেন।
কিন্তু পাকিস্তান থেকে তিনি যে চলে গেলেন, এর কী হলো ? বলল আকাশ।
কিছুই হলো না। ১৯৫৭ সালে অবশ্য তাঁকে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জীবনের প্রথম ডিএস-সি ডিগ্রি দেয়া হয়। পৃথিবীর তেত্রিশটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে সাম্মানিক ডিএস-সি ডিগ্রি দেয়া হয়।
ভাবি, চা তো ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে, বললেন কমলা।
হ্যাঁ হ্যাঁ, খাচ্ছি, বলে পাপড়ভাজা আর চা মুখে দিলেন আনজুম।
ডিএস-সি মানে ?
ডিএস-সি হলো ডক্টর অব সায়েন্স। তখন পাকিস্তানের নেতা ছিলো আইয়ুব খান। তিনি প্রফেসর সালামকে শিক্ষা কমিশনের উপদেষ্টা এবং বিজ্ঞান কমিশনের সদস্য নিয়োগ করেন।
নিয়োগ পেয়ে সালাম কী করলেন ?
নিয়োগ পেয়ে ড. সালাম পাকিস্তান সরকারকে International centre for theoritical physics (ICTP) খোলার পরামর্শ দিলেন। এতে তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যার অনেক মৌলিক কাজ হবে।
পাকিস্তান সরকার সেই পরামর্শ শোনেনি ? বলল আকাশ।
শোনলে তো ভালোই হতো। তাদের অর্থমন্ত্রী কী বলেছেন শুনবে ? অর্থমন্ত্রী সালামের প্রস্তাবের ফাইলে নোট লিখলেন— ওসবের কী প্রয়োজন ! বরং একটা পাঁচতারা হোটেল তৈরি করলে লাভ। বড়বড় বিজ্ঞানীদের আমরা আদর যত্ন করে এনে হোটেলে রাখব।
হো হো করে হেসে উঠল সবাই। গবেষণাগার তৈরি না করে হোটেল করার বুদ্ধি দিলেন অর্থমন্ত্রী। সেই দেশ কীভাবে অগ্রসর হবে ! এখনো সেই দেশ অন্ধকারেই রয়ে গেছে।
ঠিকই বলেছ, বললেন আনজুম। আরেক রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভুট্টো বললেন— পারমাণবিক বোমা বানাব। ড. সালাম তখন পরমাণু কমিশন থেকে সরে এলেন।
কমলা বললেন— তাহলে তো ড. সালাম এর মতো একজন বিজ্ঞানীর মানবিক বোধটুকু যথেষ্ট সংবেদনশীল ছিল !
হ্যাঁ, ড. সালাম মনে করতেন তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের বিজ্ঞান গবেষণায় এককভাবে এগুনো কঠিন। তিনি বলতেন— আমরা যদি একত্রিত হই, তাহলে উন্নত বিশ্বের চেয়ে কম হব না। বিজ্ঞানীদের সদিচ্ছার সাথে রাজনীতিবিদদের শুভবুদ্ধির প্রয়োজন।
খুবই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য। বললেন কমলা।
হ্যাঁ, তিনি আরো বলেছেন— পৃথিবীতে যা রোজগার হয় এবং বিনিয়োগ হয় তার তিন চতুর্থাংশ রয়েছে মাত্র এক চতুর্থাংশ মানুষের কাছে। খনিজ সম্পদের শতকরা আটাত্তর ভাগ রয়েছে সেই এক চতুর্থাংশ মানুষের কাছে।
আকাশ বলল— তাহলে পাকিস্তানে আর আইসিটিপি হলো না।
না, পরে ইতালি সরকারের আগ্রহে ত্রিয়েস্তে শহরে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। এটি এখন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
রেখা বলল— আচ্ছা আন্টি, ড. সালাম যে এত মেধাবী এবং মানবিক মানুষ ছিলেন, তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যার বিরুদ্ধে কী ভূমিকা রেখেছেন ?
আনজুম বললেন— তিনি এই গণহত্যাকে সাপোর্ট করে কিছু বলেননি আবার এর বিরুদ্ধে কোনো উদ্যোগও নেননি।
নেয়া উচিত ছিল না ? বলল সীমা।
হ্যাঁ, নিলে ভালো করতেন। আমরা তাঁর কাছ থেকে এটাই আশা করেছিলাম। রেখার ক্ষোভ।
আকাশ বলল— আন্টি, তিনি কী আবিষ্কার করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তা তো বলেননি।
হ্যাঁ, তাই তো। বলছি দাঁড়াও। ড. সালাম তখন লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের অধ্যাপক। তাঁর সাথে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিভেন ওয়াইনবার্গ এবং গাসো নামের আরো দুইজন বিজ্ঞানী গবেষণা করে প্রমাণ করতে সক্ষম হন, দুটি মৌলিক বল— দুর্বল নিউক্লিয় বল এবং তাড়িেচৗম্বক বল আসলে একই ধরনের বল। যেটি সালাম-ওয়াইনবার্গ তত্ত্ব নামে পরিচিত লাভ করে। এই সাফল্যের জন্য ১৯৭৯ সালে বিশ্ববিখ্যাত এই তিনজন বিজ্ঞানীকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।
কমলা বললেন— ড. সালাম তো বাংলাদেশও এসেছিলেন।
হ্যাঁ। তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন ১৯৮৬ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিও দিয়েছিল।
ভালো করেছে। বলল অণু।
জীবনের শেষ দিকটায় এসে এই বিজ্ঞানী পারকিনসন রোগে আক্রান্ত হন। এই রোগেই ১৯৯৬ সালের ২১ নভেম্বর তাঁর মৃত্যু হয় —বললেন আনজুম, একি বিন্দু ঘুমিয়ে পড়েছে ?
বিন্দু হাই তুলে বলল— না না, আমি ঘুমাইনি।
