আদি মহাকাব্য রামায়ণে কথিত আছে, বনবাসে সীতা তাহার দেবর লক্ষ্মণকে নিয়মিত খাবার পরিবেশন করিত; কিন্তু কখনো বলিত না যে খাইয়া লও। এই কারণে লক্ষ্মণ নাকি ঐ খাবারগুলি কখনো স্পর্শ করেন নাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নেত্রকোনার একটি হাওর অধ্যুষিত এলাকায় দুই বত্সর পূর্বে নৌ অ্যাম্বুলেন্স উপহার দিয়াছেন; কিন্তু তিনি বলিয়া দেন নাই, নৌ অ্যাম্বুলেন্স চালাইবার জন্য চালক যেন রাখা হয়। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী এই ব্যাপারে কিছু বলেন নাই, তাহার জন্য ঐ দামি নৌ অ্যাম্বুলেন্স দুই বত্সর ধরিয়া একরকম অচল পড়িয়াই রহিয়াছে। ঘটনার আদ্যোপান্ত বিবরণ গতকাল শনিবার ইত্তেফাকে ছাপা হইয়াছে। প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা যায়, নেত্রকোনার চারটি উপজেলার প্রায় সবটুকুই হাওরে থাকে, যাহার মধ্যে খালিয়াজুরী বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। ইহার একদিকে সুনামগঞ্জের হাওর, অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের হাওর। এখানকার মানুষ বাঁচিয়া থাকে প্রকৃতির সহিত যুদ্ধ করিয়া। যেই কারণে এমন হাওরের শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থাসহ নাগরিক সকল সুবিধাই অমাবস্যার চাঁদ যেন। এমতাবস্থায় এই দ্বীপ সফরে গিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খালিয়াজুরী উপজেলাবাসীকে ২০১৮ সালে উপহার দিয়াছিলেন একটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স।
নিশ্চয়ই লক্ষাধিক জন-অধ্যুষিত খালিয়াজুরি উপজেলাবাসী আশায় অনেক বুক বাঁধিয়াছিল। হঠাত্ কেহ অসুস্থ হইয়া পড়িলে তাহাকে নিদেনপক্ষে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লইয়া যাওয়া যাইবে! কিন্তু বিধি বাম। কমিউনিটি বেজড হেলথ কেয়ার প্রজেক্টের আওতায় এই নৌ অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়া হইলেও ইহা চালাইবার জন্য চালকের কোনো পদ সৃষ্টি করা হয় নাই। কারণ, তাহাও বোধকরি প্রধানমন্ত্রীকেই বলিয়া দিতে হইবে! নেত্রকোনার খালিয়াজুরীর মতো চাঁদপুরের চরাঞ্চলবাসীর ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া কোটি টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক দুইটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স অযত্ন আর অব্যবস্থাপনায় নষ্ট হওয়ার খবর ইতিপূর্বে আমরা দেখিয়াছি। দরিদ্র চরাঞ্চলবাসীর জন্য ২০০৮ সালে কোটি টাকা মূল্যের একটি অত্যাধুনিক নৌ অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দিয়াছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। আমরা ইতিপূর্বে দেখিয়াছি, বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নানান সময়ে কোটি কোটি টাকা মূল্যের মেডিক্যাল যন্ত্রাংশ অযত্ন-অবহেলায় পড়িয়া থাকিয়া নষ্ট হইয়া গিয়াছে; কিন্তু ঐ সকল যন্ত্রপাতি চালাইবার জন্য কোনো অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হয় নাই। অর্থাত্ বহু মূল্য দিয়া তেজি ঘোড়া ক্রয় করা হইয়াছে; কিন্তু ঘোড়া পরিচালনার জন্য নগণ্য মূল্যের সামান্য ‘চাবুক’ কেনা হয় নাই।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না, তৃণমূল স্তরে চিকিত্সাসেবা পৌঁছাইয়া দিতে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার অভাব নাই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়িয়া তোলা হইয়াছে, নিয়োগ দেওয়া হইতেছে নূতন নূতন চিকিত্সকও; কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই বিদ্যমান বিবর্ণ চিত্র উজ্জ্বল হইতেছে না কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়। তাহার কারণ কিছু কর্মকর্তার রোবোটিক কর্মকাণ্ড। ভাবখানা এমন যে নৌ অ্যাম্বুলেন্স দিয়াছে, চালকের কথা তো বলে নাই—আমি কী করিতে পারি? সুতরাং কেবল অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাইলেই সমস্যার সমাধান হয় না, দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রয়োজন দায়িত্ব লইয়া ভালো কাজ করিবার সদিচ্ছারও। আমরা আশা করিব, দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বাস্তব বুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই ধরনের সমস্যার সহজ সমাধান করিতে অযথা বিলম্ব করিবেন না।
