করোনাকালীন কৃষি অর্থনীতি

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৩৭

নওরিন তামান্না

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান তিনটি খাতের মধ্যে কৃষি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। সাম্প্রতিক  বছরগুলোতে কৃষির তুলনায় ‘সেবা’ ও ‘শিল্প’ খাত থেকে বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন হলেও দেশের সর্বাধিক কর্মসংস্থানের যোগান দিয়ে আসছে কৃষি খাত। দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ এবং শ্রমশক্তির ৬০ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। বিগত কয়েক দশকে উত্পাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তথাপি কৃষিকে সম্মুখীন হতে হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের অভাব, অনিয়ন্ত্রিত বাজারব্যবস্থাসহ নানান প্রতিবন্ধকতার।

একথা বলছি তখন, যখন ‘করোনা ভাইরাস’ নামক প্রতিবন্ধকতায় বিশ্ব স্থবির হয়ে রয়েছে। বিগত সাড়ে ছয় মাস ধরে অনেকাংশেই স্থবির রয়েছে দেশের ‘শিল্প’ ও ‘সেবা’ খাত। কমে এসেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণসহ সব অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। সেক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতিতে এক বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এক বিশাল জনগোষ্ঠী হারিয়েছে কর্মসংস্থান, হয়ে পড়েছে বেকার। বর্তমানে কিছু প্রতিষ্ঠান সচল হতে শুরু করলেও স্বাভাবিক হতে পারছে না। অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা করোনার ফলে সৃষ্ট সংকট, অর্থনৈতিক ধস ও করোনা-পরবর্তী সময়ে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করেছেন। এমন পরিস্থিতিতেও থেমে নেই কৃষি ও কৃষির উত্পাদন। মাঠে কাজ করে চলেছেন কৃষক। বর্তমানে দেশে অর্থনীতির ভিত্তি অনেকাংশেই কৃষিনির্ভর হয়ে উঠেছে।

কর্মসংস্থান বন্ধ থাকায় একদিকে কমে গেছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। পাশাপাশি এই সংকট সৃষ্টির জন্য দায়ী এক শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য, অসাধু ব্যবসায়ী, কালোবাজারি সিন্ডিকেট। যারা করোনা মহামারিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করছে ত্রাসের রাজত্ব। অচিরেই এই সমস্যা সমাধান করতে না পারলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েও আমাদের অর্থনৈতিক ধস নেমে আসবে। শুধু কৃষি সেক্টরটাই ধসে পড়বে না, তার সঙ্গে সঙ্গে দেশের ভবিষ্যত্ও হুমকির মুখে পড়বে।

 তবে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে কৃষি উত্পাদন ও বিপণন ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। যদিও সেখানে দ্রব্য বাজারজাতকরণ ও ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির কোনো বিষয় উল্লেখ করা হয়নি, তবে পণ্য সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৫ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সরাসরি কৃষক পর্যায় থেকে ন্যায্যমূল্যে প্রায় ১৯ লাখ টন শস্য কিনে নেওয়ার ঘোষণা দেন সরকার। নতুন অর্থবছরে বাজেটে ৩ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা কৃষির জন্য বরাদ্দের পাশাপাশি ২০০ কোটি টাকার ভর্তুকিমূল্যে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ করা হয়েছে। কৃষি, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রায় সামগ্রিক কৃষি খাতে সর্বমোট ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়াও কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।

কম সুদে জামানতবিহীন ঋণ প্রদান, প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা, ভর্তুকি প্রদান, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি-সার-উন্নত মানের বীজ বিতরণ, সুনিয়ন্ত্রিত  বাজারব্যবস্থা, সুনির্ধারিত দামব্যবস্থা, সরবরাহব্যবস্থা ও পণ্যের যথাযথ বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সেটি সর্বক্ষেত্রে ফলপ্রসূ করতে হলে প্রয়োজন সরকারের কঠোর নজরদারির। মধ্যস্বত্বভোগী, অসাধু ব্যবসায়ী, সিন্ডিকেট, উচ্চপদস্থ দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা কর্মচারীদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে। ভোক্তা ও উত্পাদকের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে হবে। কৃষিযন্ত্র উত্পাদনে দেশীয় তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা এবং পারিবারিক কৃষির প্রসারে বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। কৃত্রিম সংকট এড়াতে সরকারি উদ্যোগে ন্যায্যমূল্যে পণ্য কিনে নিয়ে মজুত রাখতে হবে। সব প্রণোদনা সহায়তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সরাসরি মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছে সব সুবিধা পৌঁছাতে পারলে তা কৃষকমহলসহ গোটা দেশের অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়