রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম আর নেই। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) আইসিইউতে চিকিত্সাধীন অবস্থায় গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এদিকে অ্যাটর্নি জেনারেলের মৃত্যুতে আইন অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।
গত ৪ সেপ্টেম্বর জ্বর ও গলাব্যথা নিয়ে সিএমএইচ হাসপাতালে ভর্তি হন মাহবুবে আলম। ঐ দিনই করোনা পরীক্ষায় তার রেজাল্ট পজিটিভ আসে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ভোরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। গত রবিবার তার শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হয়। মাহবুবে আলমের পুত্র সাংবাদিক সুমন মাহবুব ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, তার পিতা সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে ইন্তেকাল করেছেন। তবে সর্বশেষ তার করোনা ভাইরাস পরীক্ষায় ফল নেগেটিভ এসেছিল বলে গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম। পেশাগত জীবনে দেওয়ানি মামলায় তিনি একজন বিশেষজ্ঞ আইনজীবী ছিলেন। তিনি বেশ কিছু ঐতিহাসিক মামলা পরিচালনা করেছেন। এর মধ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সংবিধানের ৫ম, ৭ম, ১৩তম ও ১৬তম সংশোধনী মামলা, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন মামলায় আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেছেন। হাইকোর্টে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় নিহত ৫৭ সেনা কর্মকর্তা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন।
মাহবুবে আলম স্ত্রী, এক পুত্র ও কন্যা রেখে গেছেন। তার পুত্র সুমন মাহবুব সাংবাদিকতা, কন্যা শিশির কনা ও জামাতা শেখ রিয়াজুল হক আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন। স্ত্রী বিনিত মাহবুব একজন চিত্রকর। মাহবুবে আলম বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও গণফোরামের সাবেক আইন সম্পাদক ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শোক:গতকাল এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, মাহবুবে আলম বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা পরিচালনায় অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন একজন প্রথম সারির যোদ্ধা। পৃথক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তিনি একজন প্রথিতযশা আইনজীবী হিসেবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক আইনি বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ভূমিকা রেখেছেন এবং সবসময় ন্যায়নিষ্ঠ থেকে আইনপেশায় নিয়োজিত ছিলেন, যা অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।
এছাড়া অ্যাটর্নি জেনারেলের মৃত্যুতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, ১৪ দলের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র আমির হোসেন আমু, জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি ও সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বীরপ্রতীক, খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিনউদ্দিন ও সম্পাদক মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল পৃথক বিবৃতিতে শোক প্রকাশ করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
জীবনবৃত্তান্ত :অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম ১৯৪৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার মৌছামান্দ্রা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও ১৯৬৯ সালে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৩ সালে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য হন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইন পেশা পরিচালনার অনুমতিপ্রাপ্ত হন এবং ১৯৮০ সালে আপিল বিভাগে আইন পেশা পরিচালনার অনুমতি পান। ১৯৯৮ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
মাহবুবে আলম অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন। ২০০৯ সালে মাহবুবে আলম বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। এছাড়া পদাধিকারবলে তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
