তথ্যপ্রযুক্তির এই রকেটগতির যুগে বলা হয়—তথ্যই শক্তি। অর্থাত্ যাহার নিকট যত নির্ভরযোগ্য তথ্য রহিয়াছে, তাহারা তত উন্নত ও শক্তিশালী। ধরা যাউক, কোভিড-১৯-এর কথা। ইহা ঠিক সময়ে জোরদারের সহিত তুলিয়া ধরিলে এই বত্সর মার্চ মাস হইতে বিশ্বের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা নাও হইতে পারিত। অর্থাত্ সঠিক সময়ে সঠিক তথ্যের অভাব এই বিশ্বকেই কয়েক দশক পিছাইয়া দিয়াছে। ইহা তো গেল বৈশ্বিক দিক। তথ্য জানিবার অধিকার আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা আনয়ন ও দুর্নীতির লাগাম টানিয়া ধরিবার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকটি সরকারি এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি দপ্তরের কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও জবাবদিহিতার আওতায় আনিবার জন্য ২০০৯ সালে আমাদের দেশেও তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করা হইয়াছে। মজার ব্যাপার হইল, বর্তমানে বাংলাদেশে ১ হাজারের অধিক আইন রহিয়াছে, ইহার মধ্যে একমাত্র তথ্য অধিকার আইনটিই জনসাধারণ প্রয়োগের ক্ষমতা রাখে। অর্থাত্ রাষ্ট্রের সকল আইন জনগণের উপর প্রয়োগ করিবার জন্য, কেবল তথ্য অধিকার আইনটি জনগণ রাষ্ট্রের উপর প্রয়োগ করিতে পারে।
তথ্য অধিকারের মূল উদ্দেশ্য একটি দেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের ক্ষমতায়ন সৃষ্টি। এই জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের আইন ‘আলোকিত আইন’ নামে পরিচিত। কিছু কিছু দেশে এই আইনের শিরোনাম হইল তথ্য স্বাধীনতা আইন। গতকাল ছিল বিশ্ব তথ্য অধিকার দিবস। দিবসটি ২০০২ সালে বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়াতে ঘোষিত হইলেও ইহার চর্চা ইউরোপে অনেক পুরাতন। ১৭৬৬ সালে প্রথম সুইডেনে এই ধরনের আইন প্রথম প্রবর্তিত হয়, যাহা সেই সময় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আইন নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৭০টি দেশে তথ্য অধিকার জাতীয় আইন বিভিন্ন শিরোনামে প্রচলিত রহিয়াছে। কেবল বাংলাদেশ নহে, সার্কভুক্ত অধিকাংশ রাষ্ট্রই তথ্য অধিকার আইন প্রবর্তন করিয়াছে। এই আইনের ফলে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ এবং সরকারি ও বিদেশি অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহির পাশাপাশি দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশে দায়িত্ব পালন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ রচিত হইয়াছে। যদিও অনেকেই মনে করেন, সেই পথ এখনো পুরোপুরি জঞ্জালমুক্ত ও পরিষ্কার হয় নাই।
তথ্য জানিবার জন্য রহিয়াছে সরকারি পোর্টাল ‘তথ্য বাতায়ন’। এই পোর্টালে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রণালয় হইতে ইউনিয়ন পর্যন্ত সরকারি অফিসের সংখ্যা ৪৬ হাজার ৬৫৪টি। অন্যদিকে, মন্ত্রণালয় হইতে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সরকারি অফিসের ‘তথ্য বাতায়ন’-এর সংখ্যা ৩২ হাজার ৯০৬টি। অর্থাত্ এখনো কিন্তু সকল অফিসে ‘তথ্য বাতায়ন’ চালু করা হয় নাই। তাহা ছাড়া সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থার কোনো কোনো ওয়েবপোর্টালে তথ্য অধিকারের নির্দিষ্ট ঘর বা ট্যাব রহিয়াছে, আবার কোনো কোনোটির তাহা নাই। আবার নির্দিষ্ট ঘর থাকিলেও বহুক্ষেত্রেই প্রদত্ত তথ্য হালনাগাদ করা থাকে না। অন্যদিকে যে কোনো সরকারি অফিসে তথ্য চাহিয়া আবেদন করিলে তাহা যে খুব সহজেই পাওয়া যায়, কিংবা হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়—এই ব্যাপারে অনেকের অভিজ্ঞতাই খুব একটা ইতিবাচক নহে। দীর্ঘসূত্রতার সমস্যা তো রহিয়াছেই। অর্থাত্ ১১ বত্সর ধরিয়া আইনটি চালু হইয়াছে বটে; কিন্তু এখনো সাবালক হয় নাই বলিয়া অনেকে মনে করেন। আমরা আশা করিব, আইনটির সাবালকত্ব অর্জন করিবার পথ প্রশস্ত হইবে।
