মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলমকে। এর আগে তার মরদেহ নেওয়া হয় সুপ্রিম কোর্টে—যেখানে ৪৫ বছর আইন পেশায় নিযুক্ত ছিলেন তিনি। পরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান বিচারপতি, সরকারের মন্ত্রীগণ, আইনজীবীসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে তার কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুর ১টায় তাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মাহবুবে আলমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারকাজ অনুষ্ঠিত হয়নি। সকালে বিচারপতিদের বেঞ্চে না বসার সিদ্ধান্ত দেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। তিনি বলেন, তার মৃত্যুতে আমরা ব্যথিত।
গত রবিবার সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) আইসিইউতে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান অ্যাটর্নি জেনারেল। গত ৪ সেপ্টেম্বর করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানেই মৃত্যু হয় তার। পরে তার মরদেহ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় অ্যাটর্নি জেনারেলের মরদেহ হিমঘর থেকে পুলিশের লাশবাহী ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে মিন্টোরোডের সরকারি বাসভবনে নেওয়া হয়। মরদেহ নেওয়ার পর তাকে শেষ বারের মতো দেখেন স্ত্রী বিনতা মাহবুব, ছেলে সুমন মাহবুব, মেয়ে শিশির কণাসহ আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধরা। এ সময় তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সকাল সাড়ে ১০টায় বাসভবন থেকে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে রওনা দেয়। এ সময় গাড়ি ধরে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন তার স্ত্রী। তিনি বারবার বলতে থাকেন, ‘তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও।’ এ সময় এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
বেলা ১১টার দিকে অ্যাটর্নি জেনারেলের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে পৌঁছে। পরে নেওয়া হয় আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে। সেখানে বেলা সাড়ে ১১টায় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনসহ আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিগণ, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, বিপুলসংখ্যক আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ যোগ দেন। জানাজা শেষে তার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মে. জে. এস এম শামীমুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার সামরিক সচিব মে. জে. নকিব আহমেদ চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারপতিগণ।
এছাড়া আইনমন্ত্রী, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী, রেলমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের পক্ষে আইনবিষয়ক সম্পাদক কাজী নজিবুল্লাহ হিরু, ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, পুলিশের আইজি ড. বেনজীর আহমেদ, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব গোলাম সারওয়ার, ডিএমপি কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ নেতৃবৃন্দ, ল রিপোর্টার্স ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আখতারুজ্জামান, বিএসএমএমইউর ভিসি কণক কান্তি বড়ুয়া, ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
জানাজায় সমবেতদের উদ্দেশে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, আইন পেশা ও আইনজীবীদের প্রতি দায়বদ্ধতা রক্ষার জন্য মাহবুবে আলম নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে গেছেন। সেই দায়বদ্ধতা রক্ষা করতে গিয়ে যদি কোনো ভুল করে থাকেন, তবে আপনারা তাকে ক্ষমা করে দেবেন।
মাহবুবে আলমের ছেলে সুমন মাহবুব কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, কোনোভাবে যদি আমার বাবার দ্বারা কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেবেন। তার জন্য দোয়া করবেন। আমার বোন এই আইনজীবী সমিতির সদস্য, তার প্রতি আপনারা খেয়াল রাখবেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুর পৌনে ১টার দিকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের সমাধির পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। এ সময় আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি জাহিদ সারওয়ার কাজল, অ্যাটর্নি জেনারেলের ছেলেমেয়েসহ আত্মীয়স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। পরে তার আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া করা হয়।
মাহবুবে আলমের চলে যাওয়া আইন অঙ্গনে বিশাল শূন্যতা তৈরি হলো :আইনমন্ত্রী
সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, মাহবুবে আলমের কর্মময় জীবন আগামী দিনের আইনজীবীদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হবে। তিনি বলেন, ‘আজ সুপ্রিম কোর্ট আছে কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নেই। এটা আমি মেনে নিতে পারছি না। তার এই চলে যাওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট তথা সারা দেশের আইন অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হলো।’
