‘বড় ভাইদের’ প্রশ্রয়ে ওরা ধর্ষক

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:৩৬

স্বামী-স্ত্রীকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনার চার দিন পরও শহরে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, বক্তৃতা-বিবৃতি অব্যাহত রয়েছে। সবাই ঘটনার বিচারের পাশাপাশি ধর্ষক, ছিনতাই, চাঁদাবাজ চক্রের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা গডফাদারদেরও মুখোশ উন্মোচনের দাবি জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দলীয় ‘বড় ভাইদের’ আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা এমন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাই ধর্ষক, চাঁদাবাজ ছাড়াও তাদের এই গডফাদারদেরও বিচারের আওতায় আনা দরকার। না হলে এই অশুভ চক্র নির্মূল হবে না।

জানা গেছে, ক্ষমতাসীন পার্টির নামে দীর্ঘদিন থেকেই সিলেটে নগরীসহ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ জন্ম নিয়েছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের শুধু রূপ বদলায়। তাদের কাজই হচ্ছে, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ, অবৈধ দখলবাজি, খুন, ধর্ষণসহ নানা অপকর্মের মাধ্যমে এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ অর্থ উপার্জন। তরুণ, স্মার্ট, সাহসী ও মেধাবী ছেলেদের লুফে নেয় তাদের ‘বড় ভাইরা’। সংগঠনের আদর্শের চেয়ে ‘বড় ভাই’ তাদের বড় আদর্শ। তারা দলের স্লোগান ছেড়ে এই ‘বড় ভাইয়ে’র নামেই স্লোগান দেয়, সড়কে সড়কে তাদের ঢাউস সাইজের ছবি টাঙায়। সেই বড় ছবির পাশে ছোট্ট করে ‘সৌজন্যে’ লেখে নিজের একটা ছোট ছবি দেয়।  গ্রাম থেকে আসা সেই সুবোধ ও মেধাবী ছেলেটি একসময় হয়ে ওঠে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা এলাকার বড় ত্রাস। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যও তাদের বন্ধু হয়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে সখ্যতা দেখলে ‘ওপরে হাত আছে’ মনে করে সাধারণ মানুষ ভয় পেতে শুরু করে।

নগরীর টিলাগড়, গোপাল টিলা, মেজর টিলা, শিবগঞ্জ, বালুচর, এয়ারপোর্ট রোড, শাহী ঈদগাহ, বাদামবাগিচা, আখালিয়া, তালতলায় ও ভার্থখলায় ক্ষমতাশীন দলের বিভিন্ন দল-উপদল গড়ে উঠেছে। তাদের দাপটে এলাকাবাসী তটস্থ। একসময় সাপ্লাই গ্রুপ, কাশ্মীর গ্রুপ ছিল সিলেটের ত্রাস। এখন সব ছাপিয়ে টিলাগড় গ্রুপ সবার ওপরে।

এখন-ই সময় : ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজের টিলাগড় এলাকা দীর্ঘদিন থেকে এক মূর্তমান আতঙ্কের নাম। এলাকাটিতে আশির দশক থেকে কত খুন, রাহাজানি, ছিনতাই, নারী ধর্ষণ, ইভটিজিং ঘটেছে তার হিসাব নেই। অনেকেই বলেন, ‘স্বামীর সামনে স্ত্রীকে গণধর্ষণ করে এমসি কলেজের ১২৮ বছরের ঐতিহ্যকে ধুলিসাত্ করল এবারের ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। সিসিক মেয়র বলেছেন, এমন অপকর্ম যারা করে, তারা কোনো দলের হতে পারে না। ধর্ষকরা ঐতিহ্যবাহী কলেজের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করেছে। পাশাপাশি তারা সিলেটের ভাবমূর্তিকেও কলুষিত করেছে। সিলেট আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বলেন, অপরাধী যে দলেরই হোক, শাস্তি অবশ্যই পেতে হবে। তাদের বিষদাঁত ভাঙার এখনই সময়। সেসঙ্গে অপরাধীদের গডফাদারের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট মো. লুত্ফুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. নাসির উদ্দিন খান, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ প্রমুখ একই দাবি জানিয়েছেন। 

মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা নতুন নয় : এদিকে ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত এজাহারভুক্ত আসামিদের নাম, পরিচয় ও ছবি প্রকাশ পাওয়ায় তাদের অতীত কুকীর্তিও বেরিয়ে আসছে।  ধর্ষিতার স্বামীর দায়েরকৃত মামলার প্রধান আসামি এম সাইফুর রহমান। সে বালাগঞ্জ কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। ঐ সময়েই উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতিরই ছিল বলে স্থানীয়রা জানান। তার চেহারায় ফুটে থাকে এক ভয়ংকর সন্ত্রাসীর রূপ। এমসি কলেজ ও ছাত্রাবাসে এমন কোনো অপকর্ম নেই যেখানে তার হাত ছিল না। অবৈধ সিট দখল, সিট বাণিজ্য, খাবারের টাকা না দেওয়া, ক্রীড়াসামগ্রীর জিনিসপত্র বিক্রি করে দেওয়া, সাধারণ ছাত্রদের হয়রানি, মারধর, মিছিল-মিটিংয়ে যাওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করা ছিল তার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। ছাত্রাবাসের পাশে বালুচর বাজারে তার যন্ত্রণায় ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ ছিল। ভয়ে এতদিন চুপসে ছিলেন তারা। কলেজ ক্যাম্পাসে সাধারণ ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা ছিল সাইফুরসহ অন্যদের নেশা। সাইফুরের ভয়ে কলেজের এক ছাত্রী দেড় বছর পর্যন্ত ক্যাম্পাসে আসেনি। মেয়েদের ওড়না ধরে টানাটানি করা ছিল তার খুব সাধারণ একটি কাজ। সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অন্যদিকে, আসামি শাহ মাহবুবুর রহমান রনি একজন মেধাবী ছাত্র হলেও তার সম্পর্কে এলাকাবাসীর ভালো ধারণা নেই। সে তার এলাকায় ও সিলেটে একজন নারী উত্ত্যক্তকারী হিসেবে পরিচিত। মোটরসাইকেলে চড়ে, দামি কাপড় পড়ে এলাকায় রীতিমতো রাজপুত্রের বেশে চলাচল করত। রনি সায়েস্তাগঞ্জের একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করার পর সিলেট এমসি কলেজে পড়ার সুবাদে ছাত্রলীগ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে গডফাদারদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়। একসময় ছিনতাই, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। অন্য আসামিদের সম্পর্কেও প্রায় একই ধরনের তথ্য জানা গেছে। এলাকাবাসী তাদের এমন শাস্তি দাবি করেছে যাতে ভবিষ্যতে এমন অপরাধ আর কেউ করতে সাহস না পায়।