দিনকয়েক পরেই অনুষ্ঠিত হইতে যাইতেছে আমেরিকার প্রেসিডেনশিয়াল ইলেকশন। ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, আমেরিকার ভাগ্যের সহিত রহিয়াছে সমগ্র পৃথিবীর ভাগ্যও জড়াইয়া। সেই কারণে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের উত্তাপ শুধু মার্কিন মুল্লুকেই সীমাবদ্ধ নহে, বরং তাহা ছড়াইয়া পড়ে বিশ্বের আনাচেকানাচে। তবে এই দফা, অর্থাত্ আমেরিকার ইতিহাসে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হইবে ব্যতিক্রম এবং প্রার্থীদের জন্য অধিক চ্যালেঞ্জিং। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, আন্তর্জাতিক পটপরিবর্তন, তাহার সহিত দেশটিতে করোনা ভাইরাস মহামারির মারাত্মক প্রকোপের কারণে বদলাইয়া গিয়াছে অনেক হিসাবনিকাশ।
নাগরিকদের সরাসরি ভোটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না। বরং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পদ্ধতি হইল পরোক্ষ। প্রথমে জনগণ ভোট দিয়া ইলেকট্রোরাল কলেজ বা নির্বাচকমণ্ডলী নির্বাচিত করিয়া থাকেন। উল্লেখ্য, ব্যালট পেপারে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর নাম লেখা থাকে। আবার একেক রাজ্যের নিয়ম অনুসারে নির্বাচকমণ্ডলীর নাম উল্লেখ থাকিতে পারে, না-ও থাকিতে পারে। জনগণ কোনো নির্দিষ্ট প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অর্থ হইল, তাহার দলের নির্বাচকমণ্ডলীকে মনোনীত করা। পরবর্তী সময়ে সেই নির্বাচকমণ্ডলী ভোট দিয়া নির্বাচিত করেন জনগণের পছন্দের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে। তবে ফেডারেল আইন অনুসারে নির্বাচকমণ্ডলী কিন্তু জনগণের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে বাধ্য নহে। অর্থাত্ নির্বাচকমণ্ডলী চাহিলেও দলের বাহিরে গিয়া বিরোধী দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। তবে দেশটির ৫০টি রাজ্যের মধ্যে ২৪টি রাজ্যের আইনে এই ধরনের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ অপরাধ হিসাবে গণ্য হয়।
আমেরিকার নির্বাচনে আগাম ভোট কম জনপ্রিয় নহে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি রাজ্যে আগাম ভোট শুরু হইয়া গিয়াছে। গত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে আগাম ভোট দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গিয়াছে| এই বত্সর করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে ভোটাররা লাইনে দাঁড়াইয়া ভোট দেওয়ার পরিবর্তে আগাম ভোট দিতেই অধিক আগ্রহী। ইহা লইয়াও দেখা দিয়াছে বিড়ম্বনা। খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশ্ন তুলিয়াছেন যে, মেইলের মাধ্যমে ভোট গ্রহণে কারচুপির আশঙ্কা রহিয়াছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের নির্বাচন লইয়াও রহিয়াছে বিতর্ক। বলা হইয়া থাকে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের কথা। নির্বাচনের এত নিয়মকানুনের পরও যখন দেখা যায় তাহারা বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠিতে পারে নাই, তখন স্বভাবতই বাংলাদেশের নির্বাচন লইয়া চিন্তায় পড়িতে হয়। আমরা বুঝিতে পারি, বিশ্বের গণতন্ত্রের সবচাইতে বড় প্রবক্তা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের স্বচ্ছতা যেইখানে প্রশ্নবিদ্ধ, সেইখানে উন্নয়নশীল একটি দেশের নির্বাচন লইয়া নানা অসংগতিকে উড়াইয়া দেওয়া যায় না।
অনেকেই অভিযোগ করিয়া থাকেন, বাংলাদেশের নির্বাচন রাতের অন্ধকারে ভোটাভুটির নির্বাচন। যেইখানে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকেই আমরা ‘দিনের আলো’র নির্বাচন বলিতে পারি না, সেইখানে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের নির্বাচনকে আমরা দিনের আলো নির্বাচন বলিব সেই সময় বোধ করি এখনো আসে নাই। তবে আসিবে, নিশ্চয়ই আসিবে। দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটিতেছে। অর্থনীতির সহিত সমাজ ও রাষ্ট্রনীতির বিশেষ যোগসূত্র রহিয়াছে। সামাজিকভাবেও মানুষের মধ্যে সচেতনতা আসিতে শুরু করিয়াছে। সুতরাং আমরা অদূর ভবিষ্যতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, সামাজিক স্থিতিশীলতা ইত্যাদি দেখিতে পাইব, এই ভরসা রাখিতেই পারি।
