১৯৭১ এক সমুদ্র রক্তে অবগাহন করে যখন স্বাধীনতার অমৃতভাণ্ডার অর্জন করে বাংলাদেশ, তখন তার রাজনৈতিক আকাশে একটিমাত্র মহাতারকা দ্যুতিতে গরিমায় সবাইকে ম্লান করে দিয়েছিল। সেই মহাতারকা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার বিপুল হূদয়ের অতল ভালোবাসা উজাড় করে তিনি ভালোবেসেছিলেন বাংলাকে, বাঙালিকে। আর তাই, যুদ্ধবিধ্বস্ত নবীন দেশকে ক্রমোন্নয়নের পথে নেওয়ার জন্য তিনি সর্বদা প্রাণপাত করেছেন। তিনি চেষ্টার কোনো শেষ রাখেননি, যাতে বাংলাদেশ নিজ যোগ্যতায় আপন সামর্থ্যে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু ঘাতকের নির্মম বুলেট তাকে দেয়নি স্বপ্নপূরণের পর্যাপ্ত সময়। কিন্তু জাতির পিতার চেতনা ও অনুপ্রেরণার ধ্বজা ঊর্ধ্বে উড়িয়ে শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকা শ্মশান বাংলাকে আবার শ্যামলে-সবুজে স্নিগ্ধতায় সাজিয়ে তার বৈভবকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার জন্য জাতির ভাগ্যাকাশে উদিত হয়েছেন আরেক মহাতারকা—যিনি জাতির পিতার রক্তের উত্তরাধিকারও বহন করে চলেছেন; বিগত এক দশকে যিনি বাংলাদেশকে অগ্রগতির এমন উত্থানশীল সোপানে পৌঁছে দিয়েছেন যে সম্প্রতি এশীয় ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে। আজকের বাংলাদেশ নিয়ে যখনই কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনা হয়, তখন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভাবিতপূর্ব আর্থসামাজিক উন্নয়নের রূপকার হিসেবে যাকে কৃতিত্ব প্রদান করা হয়, তিনি আর কেউ নন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজা, তার স্বপ্নরথের সার্থক সারথি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা।
হাসিনা শব্দটি এসেছে আরবী মূল হুসনুন
থেকে যার অর্থ শ্রেষ্ঠ ধার্মিক, সর্বোচ্চ মূল্যবান, অনিন্দ্য সুন্দর। আমরা ভাগ্যবান যে, আমাদের প্রিয় নেত্রী প্রকৃতই সার্থকনামা। সর্বদা সর্বক্ষেত্রে সুফলদাত্রী, সার্থকনামা এই বঙ্গবন্ধু-তনয়ার জন্মদিন ২৮ সেপ্টেম্বর। ১৯৪৭ সালের এই তারিখে জাতির জননী ফজিলতুন্নেসার কোল আলো করে যে চন্দ্রকন্যার উদয় হয়েছিল, তার শান্ত, স্নিগ্ধ, মায়াময় জ্যোত্স্নায় আমাদের জাতীয় অঙ্গন আজ প্লাবিত। আরো দীর্ঘকাল যেন আমরা এই চন্দ্রালোকে স্নাত হতে পারি—এই কামনা করি। তার শুভ জন্মদিনে আমাদের অতল শ্রদ্ধা এবং প্রাণঢালা অভিনন্দন।
১৯৭৫-এর কাল রাতে জাতির পিতাকে সবংশে নিধনের নীলনকশা বাস্তবায়নে সামরিক উর্দিধারী খুনিরা যখন ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বরে অবস্থিত তার বাসভবনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, পিতাসহ পরিবারের বাকি সবার সঙ্গে সে রাতেই নিহত হতে পারতেন শেখ হাসিনা। কিন্তু বিধিলিপি ছিল অন্যরকম। ভাগ্য তাকে সেদিন অকুস্থলে থাকতে দেয়নি। ছোট বোন শেখ রেহানাসহ তিনি তখন ইউরোপে। বঙ্গবন্ধু-পরবর্তী বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগের নৌকার হাল ধরার জন্যই যেন আল্লাহ সেদিন তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। বাংলার ভবিষ্যত্ ভাগ্যাকাশে এক মঙ্গলময় মহাতারকা হিসেবে উদয়ের জন্যই যেন আল্লাহ সেদিন তাকে নির্বাচিত করে রেখেছিলেন।
১৯৭৫-এ জাতির পিতার নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘকাল চলেছে সামরিক জান্তার অপশাসন। বাংলাদেশ পিছিয়ে গেছে যোজন যোজন। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বেড়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। দারিদ্র্য বেড়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের শ্বাসরোধ হয়ে এল। কিন্তু স্বপ্নের মৃত্যু নেই। তাই সোনার বাংলার স্বপ্নও মরেনি। বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা সযত্নে তার পিতার স্বপ্ন লালন করেছেন আপন অন্তরে। সেই স্বপ্ন সফল করতেই তিনি সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্বদেশে ফিরেছেন, হাল ধরেছেন মৃতপ্রায় আওয়ামী লীগের এবং একে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বার গণ-আন্দোলন গড়ে তুলেছেন এবং স্বৈরশাসককে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন। কারণ, পিতার মতো তিনিও বাংলার মানুষের সত্যিকার মুক্তি চান—ক্ষুধা থেকে, দারিদ্র্য থেকে, অবিচার থেকে, নির্যাতন থেকে। ফলে, ১৯৯৬ সালে বাংলার জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে তার নেতৃত্বের প্রতি গণরায় দিয়েছে। জবাবে জননেত্রী দেখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে ধুঁকতে থাকা একটি দেশকে উন্নয়নের জিয়নকাঠি দিয়ে জাগ্রত করতে হয়।
রাষ্ট্রপরিচালনায় শেখ হাসিনার অসামান্য সাফল্যের পরও ২০০১ সালে কূটকৌশলে নির্বাচনের ফল ছিনতাই করে বিএনপি-জামায়াত জোট এবং তাদের ষড়যন্ত্রের একমাত্র লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন জনগণের নয়নমণি জননেত্রী শেখ হাসিনা। এর ফলেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলতে থাকে আক্রমণ তার জীবননাশের উদ্দেশ্যে। বার বার অনিবার্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন বঙ্গবন্ধু তনয়া প্রিয় জননেত্রী। ফিনিক্স পাখির মতো ভস্মস্তূপ থেকে পুনরুত্থানের উপমাটা বহু ব্যবহারে হয়তো পুরোনো হয়ে গেছে। তার পরও বলতে হয়, শেখ হাসিনার জন্য উপমাটা খুবই সুপ্রযুক্ত। মহান প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা, তিনি প্রিয় জননেত্রীকে শতায়ু করুন।
বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জননেত্রী শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই। তাকে ভালো রাখা, সবল রাখা, সুস্থ রাখা, নিরাপদ রাখা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, প্রাজ্ঞতা, দূরদর্শিতা এবং সক্ষম নেতৃত্বের সাহায্যে প্রতিক্রিয়াশীল কালো শক্তির বিষদাঁত প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছেন বললেই চলে। কিন্তু তার পরও পুরোনো অনেক ষড়যন্ত্রের শেকড় পুরোপুরি উপড়ে ফেলা যায়নি। তার সঙ্গে নতুন কিছুও হয়তো যুক্ত হয়েছে। লেজে থাকা প্রাণ থেকে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে হয়তো সেই কালসাপ বিবরের অন্ধকারে। মানুষকে বিশ্বাস অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু মানুষ যে চোখের চামড়াহীন অবিশ্বাসের কাজও করতে পারে সেটা মনে রাখতে হবে। পুরোনো ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার ও শাস্তি এবং নতুন ষড়যন্ত্রকারীদের শনাক্তকরণ ও বিচারের আওতায় আনার কাজ অব্যাহত এবং আরো জোরদার করতে হবে।
n লেখক : ফোকলোরিস্ট, এবং উপ-উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
