উত্তরের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি নেই

গাইবান্ধায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি, বাড়ছে দুর্ভোগ

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:২৮

উত্তরের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি নেই। গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে উত্তরাঞ্চলীয় জেলার সবগুলো নদনদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে করতোয়ার বাঁধ ধসে ১৪ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গোবিন্দগঞ্জেও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে শত শত হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। রংপুরের তারাগঞ্জ ও নাটোরের সিংড়ায় ভেসে গেছে সহস্রাধিক পুকুরের মাছ। বন্যা দুর্গতরা ছুটছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। এ বিষয়ে ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।

গাইবান্ধা :গাইবান্ধায় করতোয়া, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, তিস্তা ও ঘাঘটসহ জেলার সবগুলো নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। মঙ্গলবার করতোয়া নদীর পানি বিপত্সীমার ৮১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে পানিতে ডুবে গেছে গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ী উপজেলার নদী তীরবর্তী এলাকার কলা, আখ ও রোপা আমনসহ বিভিন্ন শাকসবজি খেত। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। এছাড়া ঘাঘট নদীর পানি বিপত্সীমা ছুঁই ছুঁই করছে। অসময়ে আকস্মিক এ বন্যায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে পলাশবাড়ী উপজেলার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের টোংড়ারদহ এলাকায় করতোয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ ধসে আকস্মিকভাবে ১৪টি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দিসহ বসতবাড়ি, হাজার হাজার বিঘা জমির রোপা আমন ধান ও অন্যান্য ফসল তলিয়ে গেছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান। কিশোরগাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম রিন্টু জানান, টোংড়ারদহ এলাকায় বাঁধটি ভেঙে যাওয়ায় কিশোরগাড়ী, বড় শিমুলতলা, কাশিয়াবাড়ী, চকবালা, সগুনা ও কেশবপুর গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় লোকজন চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছে। রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।                 গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) :গোবিন্দগঞ্জে করতোয়া নদীর কাটাখালী পয়েন্টে বন্যার পানি বিপত্সীমার ৭৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে গোবিন্দগঞ্জ হাসপাতালসহ বেশ কিছু এলাকায়। পানি উঠতে শুরু করেছে গোাবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর ভায়া ঘোড়াঘাট আঞ্চলিক মহাসড়কে। পানিতে ডুবে গেছে নদী তীরবর্তী ১৮টি গ্রামের কলা, আখ ও রোপা আমনসহ বিভিন্ন শাকসবজি খেত। প্রায় ১০ হাজার মানুষ ইতিমধ্যে পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে রয়েছেন। উপজেলার দরবস্ত, শিবপুর, সাপমারা, নাকাই, কাটাবাড়ি, ফুলবাড়ি, হরিরামপুর, মহিমাগঞ্জ, রাখালবুরুজ ও তালুকানুপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার ঘরবাড়িতেও পানি ঢুকেছে। ডুবে গেছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি।

সারিয়াকান্দি (বগুড়া) : সারিয়াকান্দিতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল মঙ্গলবার যমুনার পানি বিপত্সীমার সাত সেন্টিমিটার এবং বাঙালি নদীতে ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। উপজেলার কাজলা, চালুয়াবাড়ী, সারিয়াকান্দি, হাটশেরপুর, কর্নিবাড়ী, বোহাইল, কুতুবপুর, ভেলাবাড়ী ও নারচী ইউনিয়নের ৪০৯ হেক্টর জমির রোপা আমন, মাষকলাই, শাকসবজি ও মরিচের খেত তলিয়ে গেছে। নদীভাঙনে চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের চরদলিকায় তিন শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়ে গেছে। চর দিঘাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যমুনার ভাঙনের মুখে পড়ায় ইতিমধ্যে নিলাম ডাকা হয়েছে। যমুনার চারণ ভূমি তলিয়ে যাওয়ায় গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

সিংড়া (নাটোর) :আত্রাই নদীর পানি বিপত্সীমার ৯০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় হঠাত্ করেই চলনবিল অধ্যুষিত সিংড়া পৌর শহরে হুহু করে ঢুকতে শুরু করেছে বন্যার পানি। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বন্যার পানি শহরের প্রধান সড়ক, ব্যবসাকেন্দ্র, আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে ঘর পর্যন্ত প্রবেশ করে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে। তাজপুর উচ্চবিদ্যালয় মাঠের সামনে রাস্তাটি তীব্র স্রোতে ভেঙে গেছে। মহেশচন্দ্রপুর কলকলি বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সহস্রাধিক পুকুর ভেসে যাওয়ায় চরম ক্ষতির মুখে মত্স্য চাষিরা। তলিয়ে গেছে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর রোপা আমন এবং সবজি বীজতলা। এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে জরুরিভিত্তিতে বানভাসি ৫ শতাধিক পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন পৌরসভার মেয়র জান্নাতুল ফেরদৌস। বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে দুর্গতদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছেন জেলা প্রশাসক মো. শাহরিয়াজ।

তারাগঞ্জ (রংপুর) :উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গিয়ে সহস্রাধিক পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। পথে বসার উপক্রম হয়েছে মত্স্য প্রকল্পের মালিকসহ মত্স্য চাষিরা। যমুনেশ্বরী নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোতে বন্যা দেখা দিয়েছে। ফলে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। বাড়িঘরে বন্যার পানি উঠায় তারা গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। ঘনিরামপুর, ঝাকুয়াপাড়া, রহিমাপুর, দোয়ালীপাড়া, বুড়িরহাট, ফরিদাবাদসহ কয়েকটি এলাকায় বানা, নেটজাল দিয়েও চাষিরা তাদের মত্স্য প্রকল্প ও পুকুরের মাছ আটকাতে পারেনি। মত্স্য কর্মকর্তা কামরুন নাহার জানান, উপজেলায় শতকরা ৯৫ ভাগ পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। বন্যা পরবর্তী করণীয় বিষয়ে মত্স্য চাষিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।