ব্রিটিশ আমলে গ্রামের বড় বড় জমিদার ও তালুকদার তাদের অর্জিত স্থানান্তরযোগ্য সম্পত্তির নিরাপত্তা বিধানের জন্য লোহার সিন্দুক ব্যবহার করতেন। পরবর্তী সময়ে গ্রামের বর্ধিষ্ণু পরিবারগুলোও লোহার সিন্দুক ব্যবহার শুরু করে। লোহার সিন্দুক শুধু স্থানান্তরযোগ্য সম্পদের নিরাপত্তাই বিধান করত না, একই সঙ্গে পরিবারের আভিজাত্যও প্রকাশ করত। কারণ অর্থবিত্ত এবং পারিবারিক আভিজাত্য না থাকলে সাধারণত কেউ লোহার সিন্দুক ক্রয় করতেন না। লোহার সিন্দুকে টাকাপয়সা, সোনাদানা সংরক্ষণ করা গেলে চোর-ডাকাতের হাত থেকে অনেকটাই নিরাপদ থাকা যেত। আগে মানুষ তাদের উপার্জিত স্থানান্তরযোগ্য বৈধ আয় বা সম্পদ সংরক্ষণের জন্য লোহার সিন্দুক ব্যবহার করতেন। এখনো লোহার সিন্দুক ব্যবহূত হচ্ছে, তবে ব্যবহারে ধরন পালটে গেছে। যারা অবৈধভাবে অর্থবিত্ত অর্জন করছেন এবং ব্যাংকে প্রদর্শনের মতো প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট নেই তাদের অনেকেই এখন বাড়িতে লোহার সিন্দুকে অর্থসম্পদ সংরক্ষণ করছেন।
কয়েক মাস আগে রাজধানীর পুরান ঢাকার সরকারদলীয় খুদে নেতা, (পরবর্তীতে বহিষ্কৃত) ক্যাসিনো ব্যবসায়ী এনামুল হক এনু এবং রুপন ভ্রাতৃদ্বয়ের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যগণ অভিযান চালিয়ে বিপুল অর্থ-সম্পদ আটক করে। এই দুই ভাইয়ের মালিকানাধীনে রাজধানীতে ২০টি বাড়ি, ১২৮টি ফ্লাটসহ প্রচুর বিত্ত-বৈভবের সন্ধান পায়। এমনকি তাদের অধিকারে থাকা সিন্দুক ভেঙে নগদ ৫ কোটি টাকা পাওয়া যায়। এই টাকা তারা হয়তো বিদেশে পাচার করতেন। এভাবে অনেকেই তাদের অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ এবং অন্যান্য স্থানান্তরযোগ্য মূল্যবান সম্পদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য সিন্দুক ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একটি সূত্রমতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর পুরান ঢাকার স্টিলের দোকানে লোহার সিন্দুকের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিজের অর্জিত অর্থ বা স্বর্ণালংকার ব্যাংকে গচ্ছিত না রেখে ব্যক্তিগত লোহার সিন্দুকে সংরক্ষণ করার অর্থই হচ্ছে ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’। ফরিদপুরের বহিষ্কৃত সরকারদলীয় নেতা বরকত-রুবেল নিশ্চয় তাদের পাচারকৃত ২ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাঠানোর আগে কোনো না কোনোভাবে লোহার সিন্দুকে সংরক্ষণ করেছিলেন। পাচারকারীদের দৌলতে লোহার সিন্দুক তার পুরোনো ঐতিহ্য ফিরে পেতে চলেছে। তবে অর্থনীতিবিদগণ এই প্রবণতাকে ভালো চোখে দেখছেন না। তারা বলছেন, এটা অর্থনীতির একটি কালো অধ্যায়ের দৃষ্টান্ত মাত্র। কারণ যারা সত্ভাবে অর্থ বা সম্পদ অর্জন করছেন তারা কোনোভাবেই অর্জিত সম্পদ ব্যাংকে না রেখে ব্যক্তিগত সিন্দুকে সংরক্ষণ করবেন না। যেহেতু বাংলাদেশে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ-সম্পদ ব্যবহারের বৈধ সুযোগ নেই, তাই এগুলো বিদেশে পাচার হবে, সেটাই অনুমানযোগ্য। প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রে সংরক্ষণ না করে অর্থবিত্ত ব্যক্তিগতভাবে সংরক্ষণ করা হলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত মারাত্মক ফল বয়ে আনতে পারে। কারণ এই টাকাগুলো টোট্যাল মানি সাপ্লাই বা সার্কুলেশন থেকে বাইরে চলে যায়। অর্থাত্ বাজারে নগদ অর্থের সংকট দেখা দিতে পারে। এটা অত্যন্ত ভয়াবহ একটি প্রবণতা।
আরেকটি সূত্র মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইস্যুকৃত বিভিন্ন ধরনের নোটের মোট মূল্যমান হচ্ছে ১৪ লাখ ৪ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা আউট অব সার্কুলেশন বা বাজারের বাইরে রয়েছে। অন্য একটি সূত্রমতে, বাজারের বাইরে বা আউট অব সার্কুলেশনে রয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। ১০ বছর আগে আউট অব সার্কুলেশনে ছিল ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এমনকি করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার আগে এটা ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাত্ করোনাকালীন ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা আউট অব সার্কুলেশনে চলে গেছে। গত বছর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে টাকা পাচারের ঘটনা দ্রুত প্রকাশ পায়। এছাড়া একই সময়ে বাজারের বাইরে চলে যাওয়া টাকার পরিমাণও বেড়েছে। একজন গাড়ি চালক কীভাবে শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেলেন তা ভেবে বিস্মিত হতে হয়। একজন কলাম লেখক লিখেছেন, মালেক গজনীর সুলতান মাহমুদের মতোই অর্থ সম্পদ লুটে নিয়েছেন। কিন্তু আমি এই মতের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করি। কারণ গজনীর সুলতান মাহমুদ তার বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে দিনের পর কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে ভারতে এসে সম্পদ লুটে নিয়েছেন। কিন্তু আব্দুল মালেকরা তো কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়েই শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।
আমাদের দেশে বারবার অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। তাই আগামীতে আর কোনো সুযোগ না দিয়ে কালোটাকার মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যাতে স্বপ্নেও কেউ অবৈধ অর্থ উপার্জনের কল্পনা করতে না পারে। আব্দুল মালেকদের গ্রেফতার করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হবে। শারীরিক শাস্তি এবং সম্পদ কেড়ে নেওয়ার শাস্তি একই সঙ্গে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
