সরকারের দায়িত্বশীল বিভিন্ন সংস্থার অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেও কর্ণফুলী নদী ভরাট ও দূষণের শিকার হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম ওয়াসা, সিডিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনই কর্ণফুলী নদীর বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অভিমত। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর কর্ণফুলী নদীকে ঘিরেই আবর্তিত হওয়ায় এ নদী রক্ষার প্রধান দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায়। যদিও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১৮১৮ সালের পোর্ট লিমিটের ওপর ভিত্তি করে সমুদ্র মোহনা থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত উজানে ২ কিলোমিটার এবং হালদার অভ্যন্তরে ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত নদীর রক্ষণাবেক্ষণ, ড্রেজিং ও পাড় সংরক্ষণ তদারক করে থাকে বলে বিভিন্ন সময় দাবি করে আসছে।
চট্টগ্রাম মহানগরীর বাসিন্দা ৬০ লক্ষাধিক। এই বিশাল জনসংখ্যার প্রতিদিনকার বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ৫২টি খাল ও নালা-নর্দমা বহন করে কর্ণফুলী নদীতে ঢালছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে এই বর্জ্যের পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ২২ শত থেকে আড়াই হাজার টন পর্যন্ত হয়। ’৯০ এর দশকে নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরীর দেওয়ানহাট থেকে বারিক বিল্ডিং বন্দর ১ নম্বর জেটি পর্যন্ত মূল সড়কের নিচ দিয়ে বিশালাকার বক্স কালভার্ট নির্মাণ করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এই বক্স কালভার্টের বর্জ্যের কারণে ক্রমান্বয়ে বন্দরের ১ নম্বর জেটি বন্ধের উপক্রম হয়েছে। বক্স কালভার্টের কর্ণফুলী নদী মুখে বর্জ্য আটকানোর জন্য ব্যবস্থা রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে তা নেই। এতে করে নগরীর বিরাট অংশের ময়লা-আবর্জনা সরাসরি গিয়ে কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ সিস্টেম না থাকায় নগরবাসীর সব মলমূত্র ও বিভিন্ন নালানর্দমা হয়ে কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে।
অপরদিকে কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে কিংবা সন্নিকটে গড়ে ওঠা দুই শতাধিক শিল্প কারখানার তরল ও কঠিন বর্জ্য প্রতিনিয়ত কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে। শিল্প-কারখানাসমূহের অনেকগুলোর কেমিক্যালমিশ্রিত পানি কিংবা দূষিত পানির পরিশোধনের প্ল্যান্ট বা ইটিপি থাকলেও তা অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দূষিত পানিসমূহ সরাসরি নদীতে চলে আসে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত তদারকি না থাকায় কারখানার মালিকরা সুযোগ গ্রহণ করেন।
এদিকে চট্টগ্রাম মহানগরী অংশে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা ও বস্তির কারণে নদীর প্রস্থ যেমন সংকুচিত হচ্ছে। একইভাবে ঐসব বস্তি ও স্থাপনার বর্জ্য সহজে নদীতে ফেলার পথ সুগম হচ্ছে। বিভিন্ন পরিবেশ সংগঠনের দাবি এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও নদীর তীরবর্তী বস্তি ও অবৈধ স্থাপনাসমূহ উচ্ছেদ আশাব্যঞ্জক নয় বলে সংশ্লিষ্ট পরিবেশ সংগঠনসমূহের অভিযোগ। নদীর ওপর শাহ আমানত সেতুর কারণেও নদীতে পলি জমার মাত্রা বেড়ে চলেছে। সেতুর পিলারগুলো ঘিরে পলি জমার প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। কাপ্তাই এলাকায় দেশের একমাত্র জলবিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্রও কর্ণফুলী নদীতে পলি ও বর্জ্য জমার ক্ষেত্রে অনেকটা সহায়তা করে থাকে।
তাছাড়া কর্ণফুলী নদীতে কঠিন বর্জ্যের সঙ্গে পলিথিনের আধিক্য নদীর তলদেশের বিরাট অংশ দখল করে আছে। নদীর সদরঘাট থেকে শাহ আমানত সেতুর উজানে ২ কিলোমিটার পর্যন্ত পলিথিনের কারণে ড্রেজিং কাজ ব্যাহত হচ্ছে। নদীর বিভিন্ন অংশে ৪ মিটার পর্যন্ত পলিথিনসহ কঠিন বর্জ্যের স্তর পড়ে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০১৩ সাল থেকে সদরঘাট থেকে শাহ আমানত সেতুর উজানে ২ কিলোমিটার পর্যন্ত ক্যাপিটাল ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তা এখনো কার্যকর লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
কর্ণফুলী নদী নিয়ে গবেষণা করা পরিবেশ বিজ্ঞানী মো. ইদ্রিস আলী ইত্তেফাককে জানান, কর্ণফুলী নদী দূষণ ও ভরাটের জন্য মূলত নগরীর ৭০ লাখ লোকের দেখভাল করার জন্য যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের খামখেয়ালি এর জন্য দায়ী। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর যেমন দায়ী, একইভাবে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না। কারণ নদীর রক্ষার জন্য সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করা জেলা প্রশাসনের দায়িত্ব। কিন্তু তার কতটুকু তারা পালন করছে তা দেখার বিষয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম জানান, কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং, দূষণ, ভরাট ও দখল রোধে প্রতিনিয়ত কাজ করছে।
