নানা পরিচয়ে প্রতারণা

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২০, ২২:১২

চাকরি, তদবিরের নামে কোটি টাকা হাতানোর

অভিযোগ আগৈলঝাড়ার মিঠুনের বিরুদ্ধে

আগৈলঝাড়া (বরিশাল) সংবাদদাতা

নিজেকে কখনো প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব, কখনো প্রধানমন্ত্রীর পিএস-২-এর বন্ধু, কখনো প্রভাবশালী মন্ত্রীর পিএস, এপিএস, মন্ত্রণালয়ের সচিব, ডিসি, এসপি পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন এলাকার লোকজনের কাছ থেকে চাকরির কিংবা তদবিরের নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে মিঠুন বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তার বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়ায়। প্রতারণার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করায় এক মন্ত্রীর পিএস থানায় জিডিও করেছেন। তার পরেও তিনি এখনো প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

প্রতারিত বহু নারী-পুরুষ মিঠুনের কাছ থেকে তাদের টাকা ও শিক্ষার মূল সনদপত্র ফেরত না পেয়ে বর্তমানে বিপদের মুখে আছেন। প্রতারণার শিকার দেশের বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগীরা তার বিচার দাবি করেছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মিঠুন যেসব পরিচয় দিয়ে তাদের সমীহ আদায় করেছেন তার সবগুলোই ভুয়া। এই লোকের প্রতারণার সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যসহ রয়েছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। প্রতারণা থেকে বাদ যায়নি তার নিজের বোনও।

সিলেটের মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার বিলবাড়ি গ্রামের বীনাময় দাসের ছেলে বিপ্র দাসসহ ঐ এলাকার অনেকেই প্রতারিত হয়েছে মিঠুনের হাতে। প্রতারিত বিপ্র অভিযোগ করেন, তিনি চাকরি করেন সিলেট ভূমি অফিসে সার্ভেয়ার হিসেবে। চাকরি স্থায়ীকরণের কথা বলে ৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন মিঠুন। একইভাবে বিপ্রর খালাতো বোন পবিত্র কৈরীর মেয়ে শেফালী কৈরিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরে কম্পিউটার অপারেটর ও প্রাইমারি স্কুলে চাকরি দেওয়ার নামে গত বছর নভেম্বরে হাতিয়ে নেন ৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। সব হারিয়ে একমাত্র শিশুকন্যাকে নিয়ে এখন মানুষের বাসায় ঝিয়ের কাজ করছেন শেফালী। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিঠুন এক সময় ঢাকায় সিঅ্যান্ড এফ এর ব্যবসা করতেন। বর্তমানে স্থায়ী কোনো পেশা না থাকলেও নিজেকে ‘বিশ্বাস এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভিজিটিং কার্ড বিলাচ্ছেন মানুষকে। ব্যবসার ছদ্মাবরণে তিনি নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন সহজ সরল মানুষের চাকরি, প্রমোশনসহ নানাবিধ প্রলোভন দিয়ে প্রতারণার কাজে। চলেন ভাড়া করা বিভিন্ন নামিদামি ব্রান্ডের গাড়িতে। তার ভাড়া করা গাড়ির চালক যশোরের চৌগাছা উপজেলা সদরের মো. আব্দুল খালেকের ছেলে মো. আসাদ জানান, মিরপুর রেন্ট-এ কার থেকে তার টয়োটা করোলা গাড়ি ভাড়া করেছিলেন মিঠুন। কিন্তু তিনি ঠিক মতো টাকা দিতেন না।

মিঠুনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার জাতুয়া গ্রামের দিলীপ কৈরীর স্ত্রী রেভাও। রেভার কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ৯ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। অপরদিকে, ময়মনসিংহ জেলা সদরের ঋতিকা নামের এক নারী অভিযোগে বলেন, তাদের আত্মীয়ের একটি জমি কিনতে গিয়ে পরিচয় হয় মিঠুনের সঙ্গে। ঋতিকার বোন শামসুন নাহারের মেয়ে গত বছর ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি পরীক্ষায় অপেক্ষমান তালিকায় থাকায় তার ভর্তির ব্যবস্থা করিয়ে দেওয়ার নামে দেড় লাখ টাকা নেন তিনি। নিজেকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভিজিটিং কার্ডও দেন তাদের।

মিঠুন সম্পর্কে তার ইউনিয়নের একাধিকবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বাবুল ভাট্টি বলেন, এলাকার মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন কৌশলে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা নেওয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করলেও সে এলাকায় কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। আগৈলঝাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহ মো. লিটন বলেন, মিঠুন আওয়ামী লীগ বা সহযোগী সংগঠনের কেউ না। তিনি ১৫/২০ বছর ধরে বিভিন্নভাবে একটি চক্রকে নিয়ে সহজ সরল লোকজনকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। আগৈলঝাড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রইচ সেরনিয়াবাত মিঠুন সম্পর্কে বলেন, তার বিরুদ্ধে প্রতারণার বিস্তর অভিযোগ শুনেছেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে মিঠুন বিশ্বাস মোবাইল ফোনে বলেন, কিছু ঘটনা সত্য। তবে যত অভিযোগ উঠেছে তার সব সত্য নয়। তার ভাতিজা সঞ্জয় বিশ্বাসসহ একটি মহল তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে তিনি পালটা অভিযোগ করেন। অন্য অভিযোগের পাশাপাশি চাকরি দেওয়ার কথা বলে তার বোনের কাছ থেকেও টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গ তুললে তিনি যে টাকা নিয়েছেন তা থেকে ৩০ হাজার ফেরত দিয়েছেন বলে দাবি করেন। আর শেফালী দাসের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। শেফালীর বিরুদ্ধে তিনি একাধিক জিডি করেছেন বললেও তার কপি চাইলে তিনি রাজি হয়েও শেষ পর্যন্ত দিতে পারেননি।