টানা সাত মাস ধরে তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর অবহেলার পর এবার নিজেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সঙ্গে আছেন তার স্ত্রী ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়াও। গতকাল শুক্রবার টুইট করে ট্রাম্প করোনা পজিটিভের খবর জানান। নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে এবং ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় ঝুঁকিতে পড়েছে মার্কিন প্রশাসন ও নির্বাচন প্রক্রিয়া। খবর বিবিসি ও সিএনএনের
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বয়স ও শারীরিক ওজনের দিক বিবেচনায় করোনার কারণে ঝুঁকিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প (৭৪)। তবে ট্রাম্পের চিকিত্সক শন কনলি এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডি দুজনই ভালো আছেন এবং তারা সেরে না ওঠা পর্যন্ত হোয়াইট হাউজের ঘরেই থাকবেন। আশা করা যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সময়ের মধ্যে বিনা বাধায় তার দায়িত্ব পালন করে যাবেন। শারীরিকভাব ভালো আছেন বলে জানিয়েছেন মেলানিয়া। তবে পরীক্ষায় নেগেটিভ এসেছে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের। ট্রাম্পের সঙ্গে বিতর্কে অংশ নেওয়ায় গতকাল করোনা পরীক্ষা করিয়েছেন জো বাইডেন। তার নেগেটিভ এসেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা। ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডির দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেনও। ট্রাম্পের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবরে প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে। জাপানের নিকেই শেয়ারসূচক শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ পড়ে গেছে। ইউরোপে লন্ডন, ফ্রাংকফুর্ট এবং প্যারিসের শেয়ারবাজারের সব প্রধান সূচকে দর পড়তে শুরু করে লেনদেন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। বিশ্বে রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো ও রুশ প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুসতিনও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।
যেভাবে আক্রান্ত ট্রাম্প
ট্রাম্প মার্কিনিদের বলেছিলেন, কোভিড-১৯ নিয়ে বেশি চিন্তা না করতে। তার মতে, করোনা ভাইরাসে কেবল বয়স্ক এবং হূদেরাগীদের জটিলতা হয়। এ কথা বলার এক সপ্তাহের মধ্যেই ট্রাম্পের কোভিড-১৯ পরীক্ষার ফল পজিটিভ এলো। বৃহস্পতিবার রাতে ট্রাম্প এক টুইট বার্তায় বলেন, ‘হোপ হিকস, যিনি কোনো বিরতি না নিয়ে এত কঠোর পরিশ্রম করছেন, তিনি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কোভিড-১৯ পজিটিভ। ভয়ংকর! ফার্স্ট লেডি ও আমি আমাদের পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছি। এই সময়ের মধ্যে আমরা কোয়ারেন্টাইনে থাকার প্রক্রিয়া শুরু করব!’ এর পরই মধ্যরাতে তিনি আরেক টুইট বার্তায় বলেন, ‘আজ রাতে পরীক্ষায় আমি ও ফার্স্টলেডি কোভিড-১৯ পজিটিভ হয়েছি। আমরা আমাদের কোয়ারেন্টাইন এবং সেরে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু করব। আমরা একসঙ্গে এর থেকে বেরিয়ে আসব।’
গত বুধবার ওহাইওতে ট্রাম্প ও প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল টিভি বিতর্ক হয়। সেখানে যাওয়ার সময় বিশেষ বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্পের সঙ্গে ভ্রমণ করেছিলেন তার ৩১ বছর বয়সি উপদেষ্টা হোপ হিকস। তিনি মাস্ক ছাড়াই ক্লিভল্যান্ডে প্রেসিডেন্টের বিমান থেকে নেমেছিলেন। বিতর্কে অংশ নেওয়ার সময় ট্রাম্পের পরিবারের সদস্যদের কয়েক জনের মুখেও মাস্ক দেখা যায়নি।
বুধবার মিনেসোটাতে সমাবেশ করার সময় হোপ হিকস প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টার মেরিন ওয়ানে ছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে ফক্স নিউজের সঞ্চালক শন হ্যানিটির সঙ্গে ফোনালাপে ট্রাম্প বলেন, তিনি ও ফার্স্ট লেডি হোপের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, হিকস প্রায়শই মাস্ক পরতেন, তবু তিনি করোনায় আক্রান্ত। ট্রাম্প বেশির ভাগ সময় মাস্ক পরার বিরোধী ছিলেন এবং সরকারি কাজে প্রায়শই তার সহযোগী বা অন্যদের সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব মানতেন না বলে বিভিন্ন ছবিতে দেখা গেছে।
ট্রাম্পের স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা
করোনা ভাইরাসে ৭২ লাখেরও বেশি মার্কিনি সংক্রমিত হয়েছে এবং মারা গেছে ২ লাখ ৫ হাজারেরও বেশি। চিকিত্সকরা বলছেন বয়স, ওজন এবং পুরুষ হওয়ার কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার বয়স ৭৪ বছর এবং ওজন ১১০ কেজি। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে করোনা আক্রান্ত ৬৪ থেকে ৭৪ বছর বয়সিদের হাসপাতালে ভর্তির ঘটনা পাঁচ গুণ বেশি এবং তাদের মৃত্যুর হার ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সিদের তুলনায় প্রায় ৯০ গুণ। পরিসংখ্যান বলছে, ৭৫ বয়সি প্রতি ২৫ জনের মধ্যে এক জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে করোনা কতখানি ভোগাবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তার শরীরে এখনো নিউমোনিয়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়নি। এছাড়া ট্রাম্প ধূমপান করেন না।
কতটা ঝুঁকিতে মার্কিন প্রশাসন ও নির্বাচন
নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে ট্রাম্প করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় ঝুঁকিতে পড়েছে মার্কিন প্রশাসন ও আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচন। ট্রাম্প আগামী প্রায় দুই সপ্তাহ কোনো জনসমাবেশে অংশ নিতে পারছেন না। গতকাল শুক্রবার ফ্লোরিডায় এবং শনি ও রবিবার উইসকনসিনে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। ফ্লোরিডার মিয়ামিতে ১৫ অক্টোবরের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট বিতর্কে ট্রাম্প অংশ নিতে পারবেন কি না, সেটাও পরিষ্কার নয়।
করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর ট্রাম্প দেশ পরিচালনায় অক্ষম হয়ে পড়লে কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা। মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প অসুস্থতার কারণে সরকার পরিচালনায় ?অক্ষম হয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী অনুযায়ী তিনি ?অস্থায়ীভাবে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে পারবেন এবং কাজে ফেরার মতো সুস্থ হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব নিতে পারবেন। চিকিত্সার প্রয়োজনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ দুইবার অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছিলেন। এছাড়া অস্ত্রোপচারের কারণে আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানও একবার ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছিলেন। কিন্তু যদি ভাইস প্রেসিডেন্টও দায়িত্ব পালনে অক্ষম হন, তখন সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের জন্য এর পরেই তালিকায় আছেন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে যেমন কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট বড় রোগে আক্রান্ত হননি, তেমনি নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর স্বাস্থ্যঝুঁকির মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি। মার্কিন সংবিধানে প্রেসিডেন্টের অবর্তমানে কী হবে তা বলা আছে। অন্যদিকে প্রার্থীর অবর্তমানে কী করতে হবে তা রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক পার্টির গঠনতন্ত্রে উল্লেখ করা আছে। নিয়ম অনুযায়ী রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী অক্ষম হলে বা মারা গেলে পার্টির কনভেনশন ডাকা হবে। সেখানে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের দলের ১৬৮ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে প্রার্থী নির্বাচিত হবেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীই যে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবেন, এমন নিয়ম নেই। অন্যদিকে একই নিয়মে ডেমোক্রেটিক পার্টির ৪৪৭ সদস্যের ভোটে নতুন প্রার্থী নির্বাচিত হবেন।
