পুরুষ কেন ধর্ষণ করে? এ প্রশ্নের জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট নিকোলাস গ্রোথ বলছেন, ধর্ষণ একধরনের মানসিক বিকার। ক্রোধ ও ক্ষমতা প্রদর্শনের ইচ্ছা থেকে এর সৃষ্টি হয়। আমেরিকান লেখিকা ডায়ানা স্কালি বলছেন, ধর্ষণের সংস্কৃতি গড়ে ওঠাই ধর্ষণের কারণ। এ কথার ব্যাখ্যা দিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, একজন ব্যক্তি তখনই ধর্ষণ করে, যখন সে নিজেকে নিরাপদ মনে করে। যেহেতু তার শাস্তির ভয় থাকে না, সামাজিকভাবে তার তেমন কোনো সমস্যা হয় না, সেহেতু সেটা বারবার ঘটতে থাকে। তাছাড়া নারী নিজে থেকে তার ইচ্ছা পূরণে রাজি না হওয়াতেই সে জোর করেছে এবং এতে দোষের কিছু নেই, পুরুষের এমন মানসিকতাও ধর্ষণ সংঘটনের পেছনে ভূমিকা রাখে। এভাবেই সমাজে ধর্ষণের সংস্কৃতি গড়ে উঠতে থাকে বলে মনোবিদদের ধারণা।
বাংলাদেশেও সেই ধর্ষণের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বলে সমাজ-মনোবিদরা আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে ধর্ষণকারীর বিচার হয় না। ধর্ষণকারীকে সামাজিকভাবেও বয়কটের মুখোমুখি হতে হয় না। বরং, ধর্ষণের শিকার কিশোরী, তরুণী বা নারীই সামাজিকভাবে নিগৃহীত হয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থানে থাকায় ধর্ষণের শিকার নারীই বরং ধর্ষণকারীর ভয়ে, সামাজিক নিরাপত্তার আতঙ্কে অনেক সময় মামলা দায়েরও করতে চায় না। এর বাইরে অনেক ধর্ষণঘটনার নিষ্পত্তি সালিশ বৈঠকে নিষ্পত্তি হয়ে যায়। অনেক সময় শালিসে ধর্ষণকারীর সঙ্গে ধর্ষণের শিকার মেয়েটির বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। মেয়েটির ইচ্ছা-অনিচ্ছার গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আবার কখনো টাকার বিনিময়ে ধর্ষণের নিষ্পত্তি হয়।
অতি সম্প্রতি সিলেট এমসি কলেজ হোস্টেলে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণ, সাভারে নারী শ্রমিক, খাগড়াছড়িতে মাকে বেঁধে রেখে প্রতিবন্ধী তরুণীকে দল বেঁধে ধর্ষণের ঘটনার কথা গণমাধ্যমের বরাতে দেশবাসী জানতে পেরেছে। সংবাদপত্রের পাতায় প্রায় প্রতিদিন ধর্ষণের খবর ছাপা হচ্ছে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, অফিস, রাস্তাঘাট, গণপরিবহন কোথাও নারী শতভাগ নিরাপদ নয়। যেখানেই সুযোগ মিলছে সেখানেই এক বা একাধিক পুরুষের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারী। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, কিশোর বা তরুণ বয়সি নারীই সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এরপরেই রয়েছে শিশুরা। অর্থাত্ অল্প বয়সি মেয়েরা যাদের প্রতিরোধের সাহস নেই, তারাই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে বেশি। প্রতিদিন কতসংখ্যক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, তার সঠিক তথ্য নেই।
মানবাধিকার-বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ধর্ষণের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দিনদিন বেড়েই চলেছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে তাদের তৈরি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৮ সালে দেশে মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৭৩২টি। পরের বছর অর্থাত্ ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪১৩। আর চলতি ২০২০ সালে (জানুয়ারি থেকে আগস্ট) আট মাসে ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে ৮৮৯টি। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪১ জনকে। আর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১৯২ জনকে, যার মধ্যে ৯ জন পরে আত্মহত্যা করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে দেখা গেছে, ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি মেয়েরা সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এর পরেই রয়েছে সাত থেকে ১২ বছরের মেয়েরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে চরম নৈতিক অবক্ষয়, ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, আকাশসংস্কৃতির বিরূপ প্রভাব, মাদকের বিস্তার, বিচারহীনতা, বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা।
এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের আইনজীবী নাহিদ শামস বলেন, খুব কম ক্ষেত্রেই ধর্ষণের শিকার নারী ধর্ষণের উপযুক্ত বিচার পায়। একটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে যে সাহস নিয়ে থানায় আসে, পরবর্তী সময়ে থানায় সেই মানসিক আশ্রয় সে পায় না। তাছাড়া মামলার পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব প্রমাণ জোগাড় করতে হয়, সে বিষয়েও পর্যাপ্ত সহযোগিতা সে পায় না। দেখা যায়, ধর্ষণের শিকার মেয়েটি একবার থানায় পুলিশি জেরায় এবং পরে আদালতে আইনজীবীর জেরায় আবারও মৌখিক ধর্ষণের শিকার হয়। এসব ক্ষেত্রে ধর্ষণ মামলায় আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা, আদালতে ভিকটিমের রুদ্ধদ্বার সাক্ষ্য নেওয়া, ধর্ষণের শিকার নারীকে থানায় মানসিকভাবে আশ্রয় দেওয়ার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীবান্ধব পুলিশ সদস্য রাখার প্রতি গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি ধর্ষণের শিকার নারীসহ অসহায়দের সরকার আইনি সহায়তা সরকার দিয়ে থাকে—এই তথ্যটা প্রান্তিক মানুষ একেবারেই জানে না। এর প্রচারণা খুব জরুরি।
নাহিদ শামস বলেন, অনেক ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয়। কিন্তু এসব মামলা কোনো পরিণতি পায় না। প্রমাণের অভাবে ধর্ষণকারী খালাস পেয়ে যায়। কখনো মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, নয়তো আপসরফা হয়। ধর্ষণের শিকার নারীটির ইচ্ছার কথা গুরুত্ব কম পায়; পরিবারের সদস্যরাই সিদ্ধান্ত নেয়—আপস করবে, নাকি মামলা চালাবে। তাই ধর্ষণ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দেন তিনি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগোনো কোনো কাজের কথা নয়, যদি দেশের মানুষ সুস্থ স্বাভাবিক ও সংস্কৃতিমনস্ক হয়ে না ওঠে। তিনি বলেন, ঘরে-বাইরে, রাস্তায়, বাসে মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। কিন্তু অপরাধীদের বিচার হচ্ছে না। আইন আছে কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। থানাতেও আসামিকে বাঁচানোর চেষ্টা দেখা যায়। তিনি বলেন, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, মাস্তানি এসব প্রভাবের বাইরেও ধর্ষণের শিকার নারী তার বিচার চাওয়ার প্রাথমিক যে স্থান সেই থানায় গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় ও সহযোগিতা পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের আলামত নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যদি ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে এই পরিস্থিতি বদলাবে না।
এ প্রসঙ্গে মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল বলেন, ‘আমাদের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের বিবেক। বিবেককে ছাপিয়ে যখন প্রবৃত্তি প্রভাব বিস্তার করে, তখন ভোগবাদী সত্তা আধিপত্য বিস্তার করে। ধর্ষণকারীরা শুধু নারীলোলুপ নয়। তাই যদি হতো তাহলে ছোট্ট শিশুরা ধর্ষণের শিকার হতো না। প্রথমত, বিকারগ্রস্ত পুরুষ তার অবদমিত কাম চরিতার্থ করতে চায়। দ্বিতীয়ত, নারীর প্রতি প্রভুত্ব বা ক্ষমতা দেখাতে চায়। তৃতীয়ত, নারীকে ভোগের বস্তু মনে করে।’
মোহিত কামাল বলেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের বিকাশের সময়ে সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে। মানসিকভাবে সুস্থ মানুষ কখনো ধর্ষণকারী হয়ে উঠবে না। শিশুদের কাছ থেকে স্মার্টফোন দূরে রাখতে হবে। স্মার্টফোনের নাগাল পেলেই তাদের জন্য পর্নো সাইটগুলোতে বিচরণের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। শিশু বয়সে এ ধরনের সাইট তাদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করবে।
