করোনায় আক্রান্ত ট্রাম্প ও মেলানিয়া

কতটা ঝুঁকিতে মার্কিন প্রশাসন ও নির্বাচন

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২০, ০০:৫৩

টানা সাত মাস ধরে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আর অবহেলার পর এবার নিজেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সঙ্গে আছেন তার স¿ী ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়াও। গতকাল শুক্রবার টুইট করে ট্রাম্প করোনা পজিটিভের খবর জানান। নির্বাচনের মাত্র একমাস আগে এবং ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় ঝুঁকিতে পড়েছে মার্কিন প্রশাসন ও নির্বাচন প্রক্রিয়া। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ তাদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন। তবে চীন ভিন্ন প্রকৃতির প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। খবর বিবিসি, সিএনএন ও রয়টার্সের

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বয়স ও শারীরিক ওজনের দিক বিবেচনায় করোনার কারণে ঝুঁকিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প (৭৪)। তবে ট্রাম্পের চিকিত্সক শন কনলি এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট এবং ফার্স্ট লেডি দু’জনই ভাল আছেন এবং তারা সেরে না ওঠা পর্যন্ত হোয়াইট হাউজের ঘরেই থাকবেন। আশা করা যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সময়ের মধ্যে বিনা বাধায় তার দায়িত্ব পালন করে যাবেন। শারীরিকভাব ভালো আছেন বলে জানিয়েছেন মেলানিয়া। তবে পরীক্ষায় নেগেটিভ এসেছে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের। এছাড়া ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন ও তার স¿ী জিল বাইডেন, ট্রাম্পের মেয়ে ইভাঙ্কা ট্রাম্প, জামাতা জারেড কুশনার ও ব্যারন ট্রাম্পের নেগেটিভ ফল এসেছে।

যেভাবে আক্রান্ত ট্রাম্প

ট্রাম্প মার্কিনিদের বলেছিলেন, কোভিড-১৯ নিয়ে বেশি চিন্তা না করতে। তার মতে, করোনা ভাইরাসে কেবল বয়স্ক এবং হূদরোগীদের জটিলতা হয়। একথা বলার এক সপ্তাহের মধ্যেই ট্রাম্পের কোভিড-১৯ পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসলো। বৃহস্পতিবার রাতে ট্রাম্প এক টুইট বার্তায় বলেন, হোপ হিকস, যিনি কোনো বিরতি না নিয়ে এতো কঠোর পরিশ্রম করছেন, তিনি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কোভিড-১৯ পজিটিভ। ভয়ংকর! ফার্স্ট লেডি এবং আমি আমাদের পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছি। এই সময়ের মধ্যে আমরা কোয়ারেন্টাইনে থাকার প্রক্রিয়া শুরু করবো! এরপরই মধ্যরাতে তিনি আরেক টুইট বার্তায় বলেন, আজ রাতে পরীক্ষায় আমি এবং ফার্স্টলেডি কোভিড-১৯ পজিটিভ হয়েছি। আমরা আমাদের কোয়ারেন্টাইন এবং সেরে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু করবো। আমরা একসঙ্গে এর থেকে বেরিয়ে আসবো।

গত বুধবার ওহাইওতে ট্রাম্প ও প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল টিভি বিতর্ক হয়। সেখানে যাওয়ার সময় বিশেষ বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্পের সঙ্গে ভ্রমণ করেছিলেন তার ৩১ বছর বয়সী উপদেষ্টা হোপ হিকস। তিনি মাস্ক ছাড়াই ক্লিভল্যান্ডে প্রেসিডেন্টের বিমান থেকে নেমেছিলেন। বিতর্কে অংশ নেওয়ার সময় ট্রাম্পের পরিবারের সদস্যদের কয়েকজনের মুখেও মাস্ক দেখা যায়নি। বুধবার মিনেসোটাতে সমাবেশ করার সময় হোপ হিকস প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টার মেরিন ওয়ানে ছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে ফক্স নিউজের সঞ্চালক শন হ্যানিটির সঙ্গে ফোনালাপে ট্রাম্প বলেন, তিনি এবং ফার্স্ট লেডি হোপের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছেন।

ট্রাম্পের স্বাস্থ্য ঝুঁকি কতটা

করোনা ভাইরাসে ৭২ লাখেরও বেশি মার্কিনি সংক্রমিত হয়েছেন এবং মারা গেছেন দুই লাখ পাঁচ হাজারেরও বেশি। চিকিত্সকরা বলছেন বয়স, ওজন, স্থ্থূলকায় এবং পুরুষ হওয়ার কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার বয়স ৭৪ বছর এবং ওজন ১১০ কেজি। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে করোনা আক্রান্ত ৬৪ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের হাসপাতালে ভর্তির ঘটনা পাঁচ গুণ বেশি এবং তাদের মৃত্যুর হার ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের তুলনায় প্রায় ৯০ গুণ। পরিসংখ্যান বলছে, ৭৫ বয়সী প্রতি ২৫ জনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে করোনা কতখানি ভোগাবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। ইউএস ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনোমিক রিসার্চ জানিয়েছে, ৭০ থেকে ৭৯ বছর বয়সীদের করোনায় মৃত্যুর হার চার দশমিক ছয় ভাগ। মার্কিন বাণিজ্যমন্¿ী স্টিভ মনুচিন এবং হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ মার্ক মিয়াডোস জানিয়েছেন, ট্রাম্পের মধ্যে সামান্য উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। এর বেশি কিছু তারা জানাননি।

কতটা ঝুঁকিতে মার্কিন প্রশাসন ও নির্বাচন

নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে ট্রাম্প করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় ঝুঁকিতে পড়েছে মার্কিন প্রশাসন। কারণ তার সংস্পর্শে যারা এসেছেন তাদের সবাইকে কোয়ারেন্টাইনে যেতে হবে। যদিও হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ মিয়াডোস জানান, সবারই পরীক্ষা হয়েছে এবং নেগেটিভ এসেছে। কিন্তু আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরীক্ষা কার্যক্রম চলছে। ট্রাম্প অসুস্থতার কারণে সরকার পরিচালনায় ‍অক্ষম হয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী অনুযায়ী তিনি ‍অস্থায়ীভাবে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে পারবেন এবং কাজে ফেরার মতো সুস্থ হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব নিতে পারবেন। চিকিত্সার প্রয়োজনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ দুইবার অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছিলেন। এছাড়া অসে¿াপচারের কারণে আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানও একবার ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছিলেন। কিন্তু যদি ভাইস প্রেসিডেন্টও দায়িত্ব পালনে অক্ষম হন, তখন সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের জন্য এরপরেই তালিকায় প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার।

বিবিসি এক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি এরই মধ্যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আইসোলেশনে গেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পেলোসি বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির। কাজেই তার কাছে ক্ষমতা যাওয়ার অর্থ রিপাবলিকানদের কাছ থেকে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়া। ওয়াশিংটন পোস্ট এরকম একটা পরিস্থিতির কথা কল্পনা করে এ বছরের শুরুতে লিখেছিল, ট্রাম্প এবং পেন্সের কাছ থেকে পেলোসির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের যে কোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে নিশ্চিতভাবেই অনেক আইনি এবং রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আসবে। যুক্তরাষ্ট্রে যখন একটা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দরকার খুব বেশি, তখন এই ঘটনা সেখানে আরো বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। কাজেই এরকম পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগে এসব ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র একটি সাংবিধানিক সংকটের আশংকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে যেমন কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট বড় রোগে আক্রান্ত হননি, তেমনি নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর স্বাস্থ্য ঝুঁকির মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি। আগামী ৩ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ট্রাম্প আগামী প্রায় দুই সপ্তাহ জনসমাবেশে অংশ নিতে পারছেন না। গতকাল শুক্রবার ফ্লোরিডায় এবং আজ শনি ও কাল রবিবার উইসকনসিনে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। ফ্লোরিডার মিয়ামিতে ১৫ অক্টোবরের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট বিতর্ক। ট্রাম্পের শারীরিক অবস্থা কোন দিকে যায় তার ওপর এখন এই বিতর্কের ভাগ্য নির্ভর করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একজন উপদেষ্টা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এমন হতে পারে যে, কোয়ারেন্টাইনে থাকা প্রেসিডেন্ট সামনাসামনি বিতর্কের পরিবর্তে ভার্চুয়াল বিতর্কে অংশ নিতে পারেন।

প্রার্থীর অবর্তমানে কী করতে হবে তা রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির গঠনতন্¿ে উল্লেখ করা আছে। নিয়ম অনুযায়ী রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী অক্ষম হলে বা মারা গেলে পার্টির কনভেনশন ডাকা হবে। সেখানে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের দলের ১৬৮ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে প্রার্থী নির্বাচিত হবেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীই যে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবেন এমন নিয়ম নেই। অন্যদিকে একই নিয়মে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ৪৪৭ সদস্যের ভোটে নতুন প্রার্থী নির্বাচিত হবেন। কিন্তু ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার প্রফেসর মাইকেল ম্যাকডোনাল্ড বলেছেন, এখন কিন্তু সেই সময়টা নেই। কারণ ইতিমধ্যে অনেক রাজ্যে আগান ভোট দেওয়া হয়েছে। ২২ লাখের বেশি ভোটার ট্রাম্প-বাইডেনকে ভোট দিয়েছেন। আর নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করতে হলে সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদ উভয় কক্ষে পাশ হতে হবে।

বিশ্ব নেতাদের সহানুভূতি, ভিন্ন প্রতিক্রিয়া চীনের

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্¿ী বরিস জনসন, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্¿ী নরেন্দ্র মোদিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা। ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডির দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেনও।

তবে চীনের গ্লোবাল টাইমস’র এডিটর ইন চিফ হু জিজিন লিখেছেন, কোভিড-১৯-কে খাটো করে দেখার যে জুয়া খেলেছেন তার মূল্য দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ফার্স্টলেডি। এই খবর প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্রে মহামারির পরিস্থিতি কতোটা গুরুতর। তিনি আরো লিখেছেন, এতে ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।  হয়তো তার পুনরায় নির্বাচনেও নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে।

ট্রাম্পের করোনায় আক্রান্তের খবরে প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও বিভিন্ন দেশের শেয়ার বাজারে। জাপানের নিকেই শেয়ার সূচক শূণ্য দশমিক সাত শতাংশ পড়ে গেছে। ইউরোপে লন্ডন, ফ্রাংকফুর্ট এবং প্যারিসের শেয়ার বাজারের সব প্রধান সূচকে দর পড়তে শুরু করে লেনদেন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। বিশ্বে রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্¿ী বরিস জনসন, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো ও রুশ প্রধানমন্¿ী মিখাইল মিশুসতিনস প্রায় এক ডজন নেতা করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।