মাধব রায়, সহকারী অধ্যাপক, ব্লু বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট
আনজুম চা শেষ করে কাপ প্লেট ট্রেতে নামিয়ে রাখলেন। বিন্দু বলল— আমিও পাপড়ভাজা খাব।
খা না, তোকে না করেছে কে। অণু বলল।
বিন্দু প্লেট থেকে নিয়ে মচমচ শব্দে পাপড়ভাজা খেতে লাগল।
রেখা বলল— আন্টি আমাদের দেশের, মানে বাংলাদেশের কোনো বিখ্যাত বিজ্ঞানীর গল্প বলেন না একটা...
আনজুম বললেন— বিজ্ঞানী, শিল্পী, খেলোয়াড়, কবি এদের তো কোনো দেশ নেই। এরা তো সকল দেশের, সবার। যেমন আমাদের রবীন্দ্রনাথ, নজরুল তো সবার কবি, সবদেশের সকল মানুষের জন্য। শচীন টেন্ডুলকার, সাকিব আল হাসান, রুনা লায়লা, সুবীর নন্দী
রেখা বলল— তা বোঝলাম। তবুও আমাদের বাংলাদেশে জন্ম এরকম কোনো বিজ্ঞানীর গল্প শুনতে চাই।
তাহলে জগদীশচন্দ্র বসুর গল্প বলি ?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন আন্টি। আকাশ উত্সাহিত হলো।
জগদীশচন্দ্র বসুর জন্ম ময়মনসিংহ জেলায় ১৮৫৮সালের ৩০ নভেম্বর। তাঁর পিতা ভগবানচন্দ্র বসু ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। বিভিন্ন জেলায় চাকরি করতে হতো বলে তিনি জগদীশচন্দ্র বসুকে ফরিদপুরে এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। সেখানে গ্রামের গরিব পরিবারের ছেলেরাও পড়তে আসত। ভগবানচন্দ্র বসু কামার কুমার ছুতোরদের আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য সান্ধ্যকালীন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জগদীশচন্দ্র বসুকে সেখানেও রোজ যেতে হতো।
এরপর ১৮৭০ সালে কলকাতার এক স্কুলে ভর্তি করা হয় জগদীশকে। ১৮৭৫ সালে বৃত্তিসহ এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন তিনি। সেই কলেজে ফাদার লাফোঁ নামে এক পাদ্রী অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে বিজ্ঞান পড়াতেন এবং আকর্ষণীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানকে সহজবোধ্য করে বোঝাতেন। ফাদার লাফোঁর কাছ থেকেই জগদীশ বিজ্ঞান সাধনার প্রেরণা পেয়েছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকেই জগদীশচন্দ্র বিজ্ঞানসহ বিএ পাশ করেন। এরপর ডাক্তারি পড়ার জন্য তাঁকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়।
বিএ পাশ করে ডাক্তারি ? অবাক হয়ে প্রশ্ন করে সীমা।
হ্যাঁ, আগে ডাক্তারি পড়তে বিএ পাশ করতে হতো। কিন্তু এক বছর চিকিত্সাশাস্ত্র অধ্যয়নের পর তিনি বিজ্ঞানী লর্ড র্যালে’র সাথে পরিচিত হন এবং পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ফলে ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়ে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ক্রাইস্ট চার্চ কলেজে এসে ভর্তি হন।
ভালো করেছেন, বলল আকাশ। ডাক্তারি পড়লে আমরা হয় তো একজন ভালো ডাক্তার পেতাম। কিন্তু এত বড় একজন বিজ্ঞানী পেতাম না।
সবাই সাপোর্ট করল আকাশের কথায়।
আনজুম বললেন— হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। তিন বছর ক্রাইস্টচার্চ কলেজে পড়াশুনার পর ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ট্রাইপোস নিয়ে স্নাতক হন।
ট্রাইপোস কী আন্টি ? সীমা জিজ্ঞাস করল।
ট্রাইপোস হলো গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে প্রথম শ্রেণির সম্মান। এরপর ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে দেশে ফিরে এসে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন জগদীশচন্দ্র বসু। সেখানেও একটি মজার ঘটনা আছে।
কী মজার ? বিন্দু উত্সাহী হয়ে ওঠে।
জগদীশচন্দ্র বসু প্রেসিডেন্সি কলেজে যোগ দিয়েই দেখতে পেলেন একই কাজ, একই পদ, একই দায়িত্ব, কিন্তু ইংরেজদের বেতন বাঙালি অধ্যাপকদের চেয়ে বেশি। তিনি বললেন— সকলের এক সমান বেতন না হলে আমি বেতন নেব না। বিনা বেতনে অধ্যাপনা করলেন বেশ কিছুদিন। অনেক কষ্টে সংসার চালাতেন তখন। তবুও সমতা না এলে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে একটি টাকাও নেননি। পরে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তাঁর বেতন ইংরেজদের সমান করে দিলেন। একজন বাঙালি বিজ্ঞানী ইংরেজদের সাথে নৈতিকতার যুদ্ধে জয়ী হলেন। এরপর প্রেসিডেন্সি কলেজের একটি পরিত্যক্ত রুমকে ঝেড়ে মুছে পরিস্কার করে ফেলনা যন্ত্রপাতি, কলকব্জা, মেরামত করে সেখানে শুরু করেন গবেষণা। বিদ্যুত্তরঙ্গ নিয়ে কাজ করেন তিনি। ১৮৯৫ সালে কলকাতার টাউন হলে আমন্ত্রিত শ্রোতা দর্শকদের সামনে হাজির হলেন জগদীশচন্দ্র। তাঁর বক্তৃতায় ক্ষুদ্র বিদ্যুত্ চুম্বকীয় তরঙ্গের সাহায্যে সংকেত বা সংবাদ প্রেরণের সম্ভাবনার কথা সবাইকে জানালেন। এরপর একটি পরীক্ষা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের গবেষণাগারে কিছু যন্ত্রপাতি রেখে পাশের অন্য একটি কক্ষে গুলিভর্তি একটি পিস্তল রাখলেন। যন্ত্রপাতি চালু করে সুইচ টিপতেই দুই কক্ষের মধ্যবর্তী পুরু দেয়াল ভেদ করে প্রায় ৭৫ ফুট দূরে অন্য কক্ষের গ্রাহকযন্ত্রে সংকেত ধরা পড়ল এবং সেখানকার তড়িত্ বর্তনি উত্তেজিত হয়ে পিস্তলের ট্রিগারে চাপ দিতেই গুড়ুম করে গুলি বেরিয়ে গেল। এতে প্রমাণিত হলো, বিদ্যুত্ চুম্বকীয় তরঙ্গ বিনা তারে পুরু দেয়াল ভেদ করে চলাচল করতে পারে। পরে লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে তিনি তাঁর গবেষণা প্রবন্ধ পাঠান এবং লর্ড র্যালের সুপারিশে প্রবন্ধটি সোসাইটির পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে বিজ্ঞানী মহলের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়।
পরের অংশ আগামীকাল
