নদী ও নৌপথ রক্ষায় বর্জ্যসচেতনতা

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২০, ২১:২৮

পরিবেশ-প্রতিবেশের উপর প্লাস্টিক-পলিথিন বর্জ্যের কী বিরূপ প্রভাব পড়ে তাহা লইয়া সমগ্র পৃথিবীতে বিস্তর গবেষণা হইয়াছে এবং এখনো হইতেছে। আমাদের ফেলিয়া দেওয়া এই পণ্যগুলি মাটি হইতে বিভিন্ন ড্রেন-নালা, জলাশয়, নদী—এমনকি সমুদ্রে গিয়া পড়িতেছে। এই সকল পণ্য নদী বা সমুদ্রে টিকিয়া থাকে এক শতাব্দীকালও। যেই সকল প্লাস্টিক ভাঙিয়া যায় তাহা মাইক্রো প্লাস্টিক বা প্লাস্টিকের দানায় পরিণত হয় এবং শত শত বত্সর ধরিয়া মাটি বা পানিতে থাকিয়া যায় এবং ডিকম্পোজড হয় না। ইহাতে মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পায়, নষ্ট হয় জীববৈচিত্র্য। মানুষ সেই সকল নদী ও সমুদ্রের মাছ খাইয়া নানা অসুখবিসুখে আক্রান্ত হয়। এমনকি এই সকল বর্জ্য নৌ বা সমুদ্রপথ কণ্টকাকীর্ণমুক্ত রাখিবার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধক। বর্তমান সরকার ড্রেজিং মাস্টার প্ল্যানের আওতায় ১৭৮টি নদী খনন করিয়া প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ চলাচলের উপযোগী করিবার পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে; কিন্তু পলিথিন-প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন বর্জ্য এই খনন কার্যক্রমকে শুধু বাধাগ্রস্তই করিতেছে না, ইহাতে প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়িয়া যাইতেছে।

কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলেই অবস্থান করিতেছে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, যাহার মাধ্যমে দেশজ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই সম্পন্ন হইয়া থাকে; কিন্তু এই নদীটির ক্যাপিটাল ড্রেজিং কার্যক্রম থমকাইয়া গিয়াছে ২১ ফুট পুরু পলিথিন বর্জ্যের কারণে! এমন পরিস্থিতি তৈরি হইয়াছে যে, শক্তিশালী ড্রেজার দিয়াও তাহা তুলিয়া আনা কঠিন হইয়া পড়িয়াছে।  ইত্তেফাকে এই সংক্রান্ত একটি ছবি ছাপা হইয়াছে, যাহা দেখিয়াও আমাদের বিস্মিত হইতে হয়। আরো বিস্ময়ের ব্যাপার হইল, ড্রেজিং করিবার পর কোনো কোনো অংশ আবার নূতন আবর্জনায় ভরাট হইয়া যাইতেছে। স্বাভাবিকভাবেই ইহাতে ড্রেজিংয়ের ব্যাপ্তি ও ব্যয় বাড়িয়া যাইতেছে। এই জন্য ড্রেজিংকৃত স্থান যাহাতে পুনরায় এই সকল বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত না হয়, সেদিকে আমাদের অবশ্যই খেয়াল রাখিতে হইবে। কামরাঙ্গীরচরের রসুলপুরের উপর দিয়া বহিয়া যাওয়া বুড়িগাংসহ বাংলাদেশের এমন অনেক ছোট নদী রহিয়াছে যাহাকে বলা যায় প্লাস্টিক বা পলিথিনের নদী।

পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, বাংলাদেশে প্রতি বত্সর পলিথিনসহ ১০ লক্ষ ৯৫ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উত্পাদিত হয়। ইহার ২২ শতাংশ গ্রামে ও ৭৮ শতাংশ ব্যবহূত হয় শহরে। ইহা একটি বৈশ্বিক সমস্যাও বটে। ইউএনইপির হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে প্রতিদিন ৩ কোটি টন প্লাস্টিক বর্জ্য উত্পাদিত হয়। ইহার ৮০ লক্ষ টন প্রধান ১০টি নদীর অববাহিকা দিয়া সমুদ্রে পড়ে। এই জন্য বঙ্গোপসাগরেও অন্য দেশ হইতে বর্জ্য আসিয়া জমা হইতে দেখা যায়। অর্থাত্ নদী, সমুদ্র ও পরিবেশ রক্ষায় বিশ্ববাসীকেই সচেতন হইতে হইবে। আমাদের নদনদীগুলি যাহাতে প্লাস্টিক, পলিথিনসহ বিভিন্ন দূষণের শিকার না হয়, এই জন্য এই সকল নদী-নালার নিকটে অবৈধ স্থাপনা ও দখলদারিত্বের অবসান ঘটাইয়া যথাসম্ভব নদীর পাড় বাঁধাই, গাইড ওয়াল নির্মাণ, ওয়াকওয়ে, ইকোপার্ক নির্মাণসহ পরিবেশবান্ধব পরিবেশ এবং আধুনিক বর্জ্যব্যবস্থাপনা গড়িয়া তুলিতে হইবে। প্লাস্টিক-পলিথিনের বিকল্প ও সহজলভ্য পণ্যের উত্পাদন ও ব্যবহারের প্রতিও আমাদের হইতে হইবে যত্নশীল।