এক জ্ঞানতাপস শিক্ষক

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২০, ২১:৩০

ড. রকিবা নবী

অধ্যাপক ড. শাহ ্আলম স্যার আমাদের আইন অঙ্গনের এক নক্ষত্র। একজন আলোকিত মানুষ হয়ে স্যার গোটা সমাজকে পথ দেখিয়েছেন। স্যারের সেই পথ জ্ঞান অর্জনের পথ, মানুষকে ভালোবাসার পথ। স্যারের পদচারণায় আলোকিত হয়েছে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন পরিবার, সমৃদ্ধ হয়েছে আইন কমিশন। শাহ ্আলম স্যারের পাণ্ডিত্য এবং আদর্শ শিক্ষকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মহত্ প্রাণ সমাজসেবক।

শাহ্ আলম স্যারের হাত ধরে তিল তিল করে গড়ে উঠেছে খ্যাতিমান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ এবং বিভাগ। আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও নিবিড় কর্মের এক মহামিলন দেখতে পাই স্যারের জীবন দর্শনে। Ford Foundation-এর অর্থায়নে clinical legal education-এর উদ্ভাবক শাহ্ আলম স্যার বিকশিত করেছিলেন আইনের পাঠ্যসূচিকে, সমৃদ্ধ করেছিলেন আইন পরিবারকে। গোটা ছয়েক বইয়ের লেখক আমাদের স্যার। এর মধ্যে সমকালীন আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক সংগঠন বাংলা ভাষায় লিখিত সেরা পাঠ্যবই বললে অত্যুক্তি হবে না।

Jurisprudence ক্লাসে স্যারের সাবলীল অভিব্যক্তি এবং বাংলা ভাষায় শিক্ষা প্রদান আমাদেরকে বিমোহিত করত। শিক্ষা জীবনে আমরা ৫ম ব্যাচ স্যারকে পেয়েছিলাম শুধু ১ম বর্ষে। ২য় বর্ষে Law Vision-এ লিখব মনস্থির করে স্যারের কাছে গিয়েছিলাম পরামর্শের জন্য। স্যার আমাকে হিন্দু আইনের সংস্কার নিয়ে বাংলায় লিখতে বললেন। আমি তাই করেছিলাম।

আমাদের দুই পরিবারের দুইটি দুঃখজনক ঘটনা দুই পরিবারকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। ১৯৯৮ সালে আমরা যখন একমাত্র ভাইকে হারিয়ে বিমর্ষ, শাহ্ আলম স্যার তখন একজন বন্ধু ও আত্মীয়ের মতো আমাদের পরিবারের খোঁজখবর নিতেন। আমাদের সান্ত্বনা দিতেন। ২০০১ সাল ছিল স্যারের জীবনের সবচেয়ে দুর্বিষহ সময়, এ বছরই স্যার হারিয়ে ছিলেন তার একমাত্র সন্তান শাহ্ আদিত্য আলমকে। সে সময় স্যার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পরিবারসহ Fulbright Fellowship-এ নিউ ইয়র্কে যাওয়ার। আদিত্যর আর যাওয়া হলো না। থেমে গেল প্রাণচাঞ্চল্য, নিবেদিতপ্রাণ একজন মানুষ। আমি তখন চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। স্যারের বাহ্যিক দিকটা ছিল কঠিন এক আবরণে মোড়ানো। তার একাকিত্ব উপলব্ধি করতেন শুধু চাচি (স্যারের স্ত্রী ফৌজিয়া নাসরিন) যিনি অসাধারণ মনোবল নিয়ে জীবনের শেষ পর্যন্ত স্যারের ছায়াসঙ্গী হয়েছিলেন।

স্যারের অন্তরটা ছিল মানুষের জন্য খোলা, উদারমনা। গরিব-নিরীহ মানুষের দুঃখ-কষ্ট স্যারকে গভীরভাবে স্পর্শ করত। রিকশাওয়ালা, দুধওয়ালা থেকে শুরু করে বিভাগের, অনুষদের, আইন কমিশনের পিওন, দারোয়ান পর্যন্ত সবাইকে স্যার সাহায্য করেছেন সাধ্যমতো, কখনো সাধ্যের বাইরে। একজন পিওনের ছেলের অপারেশনে দিয়েছিলেন ৩০ হাজার টাকা। ঢাকা ভার্সিটির শিক্ষক এবং বর্তমানে UITS-এ কর্মরত ড. সাইফুল ইসলামের মাধ্যমে স্যার গাজীপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে ২৫ লাখ টাকা অভাবী মানুষের মধ্যে দান করে গেছেন নিভৃতে। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুলে স্যার ৩৫ লাখ টাকা দিয়েছেন বিভাগ ও অনুষদের উন্নয়নের স্বার্থে। স্যার তার শেষ বেলায় UITS-এ শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বিদায় বেলায় স্যার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয়ের হাতে ৫০ লাখ টাকা দিয়ে গেছেন উনার গ্রামের বাড়ি সীতাকুণ্ডে একটি কলেজের উন্নয়নের জন্য। স্যারের একটি মহত্ উদ্দেশ্য ছিল এই দানের পেছনে। স্যার এই অর্থ উত্সর্গ করেছিলেন তার অকাল প্রয়াত সন্তান শাহ্ আদিত্য আলমের নামে।

আমাদের শাহ্ আলম স্যার শুধু মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, দেশের প্রতি ছিল তার অগাধ ভালোবাসা। স্যার ভালোবাসতেন আপ্যায়ন করতে। আমাদের বিভাগে থাকাকালীন দেখেছি, কোনো উপলক্ষ্য তৈরি হলেই স্যারের বাসায় আমন্ত্রণ জানাতেন। নতুন বিবাহিত শিক্ষক দম্পতিকে আমন্ত্রণ জানানো ছিল স্যারের জন্য নিত্য ঘটনা।

২০০৪ সালে বিভাগে যোগদান করে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারলাম স্যার তার প্রতিষ্ঠানকে কতটা ভালোবাসেন। ক্লাস থাকুক বা না থাকুক, দায়িত্বে থাকুন বা না থাকুন, স্যার খুব সকালে বিভাগে যেতেন এবং বেলা ২টা-৩টা অবধি কাজ করতেন। শিক্ষকদের ভালোমন্দের দিকে নজর রাখতেন। কোনো সমস্যা হলে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে স্যার ত্বরিত তার সমাধান করতে চাইতেন। আইন কমিশন থেকে প্রথমবার পদত্যাগ করার পর স্যার বলেছিলেন, শিক্ষকতাকে অনেক মিস করেন, ক্লাসরুমে এবং শিক্ষার্থীদের অনেক মিস করেন। এ কথার অন্তরালে আইন কমিশনে কাজের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতার কথাও উঠে এসেছিল। পরবর্তী মেয়াদে স্যার এগুলোর তোয়াক্কা না করে অনেক আইনের সংস্কারের ওপর লিখিত সুপারিশমালা সরকারের কাছে প্রেরণ করেছিলেন।

সর্বোপরি, একটি কথা দিয়েই আজকের লেখার ইতি টানতে চাই। স্যার একজন নির্লোভ, নিখাদ ভালো মানুষ ছিলেন। অনেক দুর্লভ গুণের অধিকারী এই মানুষটির অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে আমরা আইন পরিবার এক কিংবদন্তি ও বটবৃক্ষকে হারালাম। স্যারের চিন্তা, ধ্যানধারণা, বিশ্বাস, কাজের পরিধি ও গভীরতা—এগুলো চর্চায় স্যারকে ধারণ করব আমাদের মধ্যে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের নামকরণ আমরা ‘ ড. শাহ্ আলম আইন অনুষদ’ করতে পারি কি না—সেটা বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। একজন কিংবদন্তি জীবন, দর্শন ও কর্মের প্রতিধ্বনি হোক আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে।

n লেখক : সহযোগী অধ্যাপক,

আইন অনুষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়