এমসি কলেজ হোস্টেলে গৃহবধূ ধর্ষণ

স্বীকারোক্তি দিল রনি আইনুল রাজনও

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২০, ২২:৩৫

সিলেটের এমসি কলেজের হোস্টেলে গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে আসামি শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, আইনুল হোসেন ও মো. রাজন। শনিবার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে ধর্ষণে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে তারা। সন্ধ্যায় সিলেটের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মো. জিয়াদুর রহমানের আদালতে রাজন, মহানগর হাকিম সাইফুর রহমানের আদালতে আইনুল ও মহানগর হাকিম শারমিন খানম নীলার আদালতে রনি জবানবন্দি দেয়।

সিলেট মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার অমূল কুমার চৌধুরী বলেন, মামলার তিন আসামি দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। এর আগে গত শুক্রবার আরো তিন জন জবানবন্দি দেয়। এ নিয়ে গ্রেফতার হওয়া আট আসামির মধ্যে ছয় জনই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এর আগে পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল শনিবার দুপুরে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে রাজন, রনি ও আইনুলকে আদালতে হাজির করে শাহপরান থানার পুলিশ। সন্ধ্যায় জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত। এরপর তাদের কারাগারে নিয়ে যায় পুলিশ। এর আগে শুক্রবার রাতে এই মামলার অপর তিন আসামি সাইফুর রহমান, অর্জুন লস্কর ও রবিউল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সূত্র জানায়, ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে গণধর্ষণের সব আলামত নষ্ট করতে চেয়েছিল ছাত্রলীগের অভিযুক্ত নেতাকর্মীরা। এ লক্ষ্যে গৃহবধূর স্বামীর গাড়িটি আটকে রেখেছিল বলে তারা আদালতকে জানায়। তারা আরো জানায়, হোস্টেলের গেটে দাঁড়িয়ে পুলিশ ভেতরে প্রবেশের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতির অপেক্ষার সুযোগে গাড়িটি ধুয়ে ধর্ষণের আলামত নষ্ট করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে শাহপরান থানার এসআই মো. সোহেল রানা এ সময় ঢুকে পড়ায় তা করতে পারেনি সাইফুর ও তার সহযোগীরা। ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমান ও অর্জুন লস্করের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে এসব তথ্য জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র। জবানবন্দিতে এ দুই আসামি বলে, তারা দুই জনসহ মোট চার জন গৃহবধূকে হোস্টেলে গাড়িতেই ধর্ষণ করে। এ সময় রবিউল ইসলাম ধর্ষণে সহযোগিতা করে।

তারেক ও মাহফুজের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ :ছাত্রাবাসে গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনায় এজাহারনামীয় তারেক ও মাহফুজের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয় শনিবার দুপুরে। বেলা সাড়ে ১১টায় পুলিশের পাহারায় তাদের সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ দুই জন পাঁচ দিনের রিমান্ডে রয়েছে। এর আগে ধর্ষণ মামলায় পুলিশ গত বৃহস্পতিবার প্রধান আসামি সাইফুর রহমান, অর্জুন লস্কর, রবিউল ইসলাম, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, রাজন মিয়া ও আইনুদ্দিনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে। আসামিদের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে ধর্ষণের শিকার ঐ গৃহবধূর ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হবে।

ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও সিসি ক্যামেরা স্থাপনের দাবি :এমসি কলেজ হোস্টেলে গৃহবধূ গণধর্ষণে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে শনিবারও বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সিলেট সিটি কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদের আহ্বানে সিসিকের ২০, ২১, ২৪ নম্বর ওয়ার্ড ও টুলটিকর ইউনিয়নবাসীর উদ্যোগে শনিবার দুপুরে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের সামনে বিশাল মানববন্ধন হয়। মানববন্ধনে নিজস্ব ব্যানার নিয়ে শতাধিক রাজনৈতিক, সামাজিক, ক্রীড়া সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকার কয়েক হাজার লোক অংশ নেন।

টিলাগড় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের মোতাওয়াল্লি অধ্যাপক সৈয়দ মকসুদ আলীর সভাপতিত্বে ও মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুবেদুর রহমান মুন্নার পরিচালনায় মানববন্ধনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সিসিক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের নেতা আজাদুর রহমান আজাদ, কাউন্সিলর আবদুর রকিব তুহিন, সিসিকের সাবেক প্যানেল মেয়র মো. শাহজাহান, শাপলাবাগ বহুমুখী উন্নয়ন সমিতির সভাপতি আতাউর রহমান, শিল্পপতি আতাউল্লাহ সাকের, ব্যবসায়ী ছানাউল্লাহ ফাহিম, টিলাগড় পঞ্চায়েত কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছমর উদ্দিন মানিক, দৈনিক সিলেটের ডাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ওয়াহিদুর রহমান ওয়াহিদ, টুলটিকর ইউপি চেয়ারম্যান এস এম আলী হোসেন, গোপালটিলা আখড়া কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিমাদ্রি কর পুরকায়স্থ, সিলেট সিটি সেন্টার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মুনিম মল্লিক মুন্না, খরাদিপাড়া আনন্দ সংসদের সভাপতি আবদুল গফফার, সেনপাড়া পুষ্পায়ন সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি আলী ওয়াসিকুজ্জামান অনি, সাদিপুর পঞ্চায়েত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক দেবদুলাল পাল দেবু, সহসাংগঠনিক সম্পাদক হিরক রঞ্জন দে পাপলু প্রমুখ।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, এমসি কলেজ ও এর আশপাশ এলাকা থেকে অপরাধ নির্মূলের জন্য টিলাগড় এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা অবস্থায় ছাত্রাবাসে অপরাধীদের অবস্থানের সুযোগ করে দেওয়ায় কলেজের অধ্যক্ষ ও হোস্টেল সুপারের অপসারণ দাবি করেন তারা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নেবে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি :এমসি কলেজ হোস্টেলে গৃহবধূকে ধর্ষণ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নেবে এই ঘটনায় গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি। শনিবার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রধান সিলেটের জেলা ও দায়রা জজ মো. বজললুর রহমান স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি নোটিশ আদালত প্রাঙ্গণে টানানো হয়।

ঐ নোটিশে উল্লেখ করা হয়—‘মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও মাননীয় বিচারপতি মহিউদ্দিন শামীম মহোদয়গণের বেঞ্চ গত ২৯ সেপ্টেম্বর একটি সুয়োমোটো রুল ইস্যু করে ঐতিহ্যবাহী সিলেট এমসি কলেজে বিগত ২৫ সেপ্টেম্বর সংঘটিত চাঞ্চল্যকর গণধর্ষণের ঘটনা অনুসন্ধানের নিমিত্ত একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেন। উক্ত ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কিংবা যারা ঘটনা সম্পর্কে অবহিত তারা উক্ত কমিটির নিকট ৪ অক্টোবর থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত অফিস চলাকালীন সময়ে জবানবন্দি প্রদান করতে পারবেন।’ কমিটির অফিসের ঠিকানা- কনফারেন্স রুম, জেলা ও দায়রা জজ আদালত (২য় তলা) ।

গত ১ অক্টোবর দুপুরে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির চার সদস্য এমসি কলেজ হোস্টেলে গিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। কমিটির সদস্যরা ধর্ষণ ঘটনার বিভিন্ন তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করেন। তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে রয়েছেন সিলেটের জেলা ও দায়রা জজ মো. বজললুর রহমান, অন্য সদস্যরা হলেন—মহানগর মুখ্য হাকিম মো. আবুল কাশেম, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মমুিনুন নেছা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শারমিন সুলতান।