রবীন্দ্রনাথের সাথে জগদীশচন্দ্রের তো গভীর বন্ধুত্ব ছিল
মাধব রায়, সহকারী অধ্যাপক, ব্লু বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট
গতকালের পর
কিন্তু আমরা তো জানি বেতার যন্ত্রের আবিষ্কারক হচ্ছেন মার্কনি। বলল আকাশ।
হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ, আনজুম বললেন। ইতালির বিজ্ঞানী মার্কনি ১৮৯৬ সালে বেতার প্রেরণ ও গ্রহণ যন্ত্র আবিষ্কার করেন।
তাহলে জগদীশচন্দ্র তো আগে আবিষ্কার করেছেন।
হ্যাঁ, বললেন আনজুম। কিন্তু তিনি পেটেন্ট করেননি। মার্কনি ১৮৯৬ সালে বেতার তরঙ্গ পাঠালেন এবং পেটেন্টের জন্য দরখাস্ত করলেন। কিন্তু ছবি না থাকায় পেটেন্ট পাননি। ১৮৯৭ সালে ছবিসহ আবার দরখাস্ত জমা দিলেন। পেটেন্ট পেলেন ১৯০০ সালের ২৬ এপ্রিল। তাঁর পেটেন্ট নং 7777।
সীমা প্রশ্ন করে— পেটেন্ট টা কী আন্টি ?
প্যাটেন্ট বোঝনি ? বললেন আনজমু। প্যাটেন্ট হলো সরকার থেকে প্রাপ্ত সনদপত্র বা আদেশদ্বারা প্রস্তুত বা বিক্রয়ের একচেটিয়া অধিকার। অর্থাত্ সরকারি সনদের বলে যে স্বত্ব সংরক্ষিত হয়েছে।
আকাশ বলল— বেতার তরঙ্গের প্রথম আবিষ্কার তো জগদীশচন্দ্রই করেছিলেন, তাহলে মার্কনি’র নামে প্যাটেন্ট হলো কেন ?
আনজুম হেসে বললেন— জগদীশচন্দ্র বসু পেটেন্ট নিতে রাজি হননি। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিজেই লিখেছিলেন— আমার বক্তৃতার কিয়ত্ক্ষণ পূর্বে এক অতি বিখ্যাত কোম্পানির ক্রোড়পতি মালিক লিখিয়া পাঠাইলেন— দেখা করিবার বিশেষ দরকার। আমি লিখলাম— সময় নাই। উত্তরে পাইলাম— আমি নিজেই আসিতেছি। অল্পক্ষণের মধ্যেই স্বয়ং উপস্থিত। হাতে প্যাটেন্ট ফর্ম। আমাকে বিশেষ অনুরোধ করিলেন, আপনি আজ বক্তৃতায় সব কথা খুলিয়া বলিবেন না...
আমি যে কাজ লইয়া আছি, তাহা বাণিজ্য লাভালাভের উপরে মনে করি, আমার জীবনের দিন কমিয়া আসিতেছে, আমার যাহা বলিবার তাহারও সময় পাই না। আমি অসম্মত হইলাম।
বিন্দু বলল— জগদীশচন্দ্র বসু বিজ্ঞানী হলেও বোকা ছিলেন। নইলে নিজের আবিষ্কার করা তত্ত্ব কেউ হাতছাড়া করার কাজ করে ?
আনজুম বললেন— তিনি প্রচারের চেয়ে কাজে বিশ্বাসী ছিলেন বেশি।
তিনি রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখলেন কেন ? রেখা প্রশ্ন করে।
রবীন্দ্রনাথের সাথে জগদীশচন্দ্রের তো গভীর বন্ধুত্ব ছিল। তিনি রবীন্দ্রনাথের চেয়ে তিন বছরের বড় হলেও এই বন্ধুত্ব খুবই আন্তরিক ছিল। রবীন্দ্রনাথ জগদীশচন্দ্রের কাছ থেকে বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি বিষয়ে অবগত হতেন, আর জগদীশচন্দ্রের অনুরোধে কিছু লেখাও লিখতেন। ইউরোপ থেকে ফিরে এসে জগদীশচন্দ্র সরকারের কাছে টাকা চাইলেন গবেষণা কাজের জন্য। এতোদিন নিজের বেতনের টাকায় গবেষণা চালিয়েছিলেন।
সরকার টাকা দেয়নি ?
না না, সরকার আরো তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এগিয়ে এলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বিশ হাজার টাকা জোগাড় করার একটা পরিকল্পনা করলেন। নানা জনের কাছে অনুরোধ করলেন। ত্রিপুরার মহারাজা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশচন্দ্র উভয়ের বন্ধু। তাঁর কাছে দশ হাজার টাকা চাইলেন রবীন্দ্রনাথ।
কিন্তু গবেষণা করে কী আবিষ্কার করেছিলেন তিনি? —বলল চন্দ্রা।
তিনি তো আবিষ্কার করেছিলেন গাছের প্রাণ আছে, বলল অণু।
না না, বললেন আনজুম। একটা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, জগদীশচন্দ্র আবিষ্কার করেছিলেন গাছের প্রাণ আছে। উদ্ভিদের প্রাণ আছে এই তথ্য আমরা অনেক আগে থেকেই জানতাম। জগদীশচন্দ্র ক্রেসক্রোগ্রাফ নামের যন্ত্র আবিষ্কার করে বাইরের নানান আঘাত ও উত্তেজনায় উদ্ভিদ কীভাবে সাড়া দেয় তা দেখিয়েছিলেন। জীবপদার্থবিদ্যা বা Biophysics নামের পদার্থবিজ্ঞানের একটা শাখা তিনি আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর আবিষকৃত যন্ত্রগুলির মধ্যে ছিল রেজোনেন্ট রেকর্ডার, প্ল্যান্টফাইটোগ্রাফ, বিদ্যুত্ তরঙ্গ গ্রাহকযন্ত্র, তেজোমিটার।
চন্দ্রা বলল— আন্টি, জগদীশচন্দ্র বসু লেখালেখিও করতেন। তাঁর সাহিত্য বিষয়ক রচনা খুবই মজার। ‘অব্যক্ত’ নামে সাহিত্যের বইও তিনি লিখেছেন। তাঁর নয়টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ‘ভাগীরথীর উত্স সন্ধানে’ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ।
তাই নাকি ! বললেন কমলা।
হ্যাঁ। ঠিকই বলেছো চন্দ্রা, বললেন আনজুম। তাঁর লেখা পলাতক তুফান বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিজ্ঞানকল্প-গল্প। ১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর কলকাতায় বসু বিজ্ঞান মন্দির নামে একটি গবেষণাগার তৈরি করেছিলেন জগদীশচন্দ্র। রবীন্দ্রনাথও এর পরিচালনা সমিতির সদস্য ছিলেন। ইংরেজগণও জগদীশচন্দ্রকে সম্মানের চোখে দেখতেন। তাঁকে নাইটহুড উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেছিল ইংরেজরা। জগদীশচন্দ্র মজা করে রবীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন— আমার একটি পুচ্ছ সংযোগ হইয়াছে। ১৯২০ সালে জগদীশচন্দ্র রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ভারতীয় বিজ্ঞানীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই সম্মানের অধিকারী হন।
এই বছরই তিনি লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে ক্রেসক্রোগ্রাফ প্রদর্শন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও জগদীশচন্দ্র বসুকে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধি দেয়।
১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর এই মহান বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়। আইনস্টাইন তাঁকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন— জগদীশচন্দ্র বসু পৃথিবীকে যেসব অমূল্য উপহার দিয়েছেন, তার কোনো একটির জন্যই তাঁর জন্য বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করা উচিত।
বিন্দু জগদীশচন্দ্রের গল্পে আনন্দ পেয়েছে। সে বলল— জগদীশচন্দ্র যদি বুদ্ধি করে আগে প্যাটেন্ট করিয়ে নিতেন তাহলে খুব ভালো হতো। আমি হলে তো আগেই করে নিতাম। অণু বলল— হ্যাঁ, তাহলে তো তুইই বিজ্ঞানী হয়ে যেতিস। বিন্দুচন্দ্র বসু। হাসির রোল উঠল একটা।
