শিক্ষকতা এমন এক মহান ব্রত, যার ওপর নির্ভর করে দেশ ও জাতির ভবিষ্যত্। শিক্ষক তার জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে শিক্ষার আলো চারদিকে ছড়িয়ে দেন। শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলেন আদর্শ মানুষ হিসেবে। ‘একজন শিক্ষক সামগ্রিকভাবে প্রভাব ফেলেন, কেউ বলতে পারে না তার প্রভাব কোথায় গিয়ে শেষ হয়’—আমেরিকার ইতিহাসবিদ হেনরি এডামসের এই কথাই প্রকাশ করে শিক্ষকের মহিমা। জ্ঞান-দক্ষতায় পরিপূর্ণ একজন শিক্ষক হচ্ছেন জাতির অমূল্য সম্পদ। শিক্ষকের কর্মক্ষেত্র শ্রেণিকক্ষ এবং শ্রেণিকক্ষের বাইরের বিশাল জগত্ পর্যন্ত ব্যাপ্ত। শিক্ষার্থীদের জীবনের অন্যতম প্রেরণার উত্স শিক্ষক। একজন আদর্শ শিক্ষক নিজের জ্ঞানভান্ডারকে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা চালান, শিক্ষার্থীদের অনুসন্ধিত্সু হিসেবে গড়ে তোলেন এবং বাতলে দেন জ্ঞান অর্জনের সঠিক পথ। তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে মূল্যবোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা, দেশপ্রেমসহ আদর্শ মানুষ হওয়ার সব গুণ প্রোথিত করেন। শিক্ষার্থীদের কাছে অবতীর্ণ হন একজন রোল মডেল হিসেবে। শিক্ষকগণ হচ্ছেন সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার তথা সমাজ নির্মাণের স্থপতি। বার্ট্রান্ড রাসেল শিক্ষকদেরকে সমাজ ও সভ্যতার বিবেক বলেছেন। জাতির বুনিয়াদ গঠনে ও জাতীয় ঐতিহ্য-লালনে শিক্ষকের ভূমিকা যে কোনো পেশাজীবীর চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক। এজন্য শিক্ষককে নিজ পেশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং নিবেদিতপ্রাণ হতে হয়।
কিন্তু শিক্ষকের দায়িত্ব-কর্তব্য এবং শিক্ষকদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা এই দুটি দিক বিবেচনা করলে জাতি হিসেবে আমাদের আজ লজ্জা পেতে হয়। কিছু শিক্ষক তাদের মূল লক্ষ্য থেকে সরে গেছেন। বৈষয়িক চিন্তায় মশগুল হয়ে ক্লাসে ঠিকমতো না পড়িয়ে ছুটে চলছেন অর্থের পেছনে। কোচিং বাণিজ্য, প্রাইভেট টিউশনিসহ বিভিন্ন আয় উপার্জনী কর্মকাণ্ডেই বেশি নিজেদের নিয়োজিত রাখছেন কেউ কেউ। কোনো শিক্ষার্থী যদি শিক্ষকের কাছে কোচিং বা প্রাইভেট না পড়ে তাহলে ভালো লেখা সত্ত্বেও কম নম্বর দিয়ে কোচিং পড়তে বাধ্য করা, ব্যাবহারিক পরীক্ষায় টাকা না দিলে ফেল করিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। শিক্ষকদের মধ্যে অবশ্যই কমিটমেন্ট টু টিচিং থাকা খুবই জরুরি। কিন্তু কিছু শিক্ষকের কমিটমেন্ট কেবল টাকাপয়সা ও ক্ষমতা অর্জনের প্রতি। যাদের টিচিং কমিটমেন্টে ঘাটতি রয়েছে তারা আসলে শিক্ষক হয়েছেন বাই চান্সে, বাই চয়েসে নয়। অনেকে টাকা দিয়ে, স্বজনপ্রীতি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় ঢুকে পড়েছেন। যখন অযোগ্য লোক শিক্ষকতার মতো পেশায় নিয়োগ পান তখন তার কাছ থেকে ভালো ফল আশা করা যায় না। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করা হয় না। অনেকে ভুয়া সনদ দিয়েই ঢুকে পড়ছেন শিক্ষকতায়। সদ্য সরকারিকৃত কলেজের আট জন শিক্ষকের সার্টিফিকেট জালিয়াতি করে চাকরি নেওয়াটা আমাদের শিক্ষা প্রশাসনের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও নানান অনিয়মের কথা শোনা যায়। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী কিংবা প্রথমসারির শিক্ষার্থীদের পরিবর্তে নানান খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে পেছনের দিককার শিক্ষার্থীদের বেছে নেওয়া হচ্ছে। এমনকি কাম্য যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও অনেককে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। মাঝেমধ্যে অর্থের বিনিময়েও শিক্ষক নিয়োগের কথা শোনা যায়। মেধা ও প্রজ্ঞার এমন অবমাননাকর পরিস্থিতিতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কীভাবে উন্নত মানের গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃজন আশা করতে পারি? কীভাবে বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ভালো জায়গায় যেতে পারি?
গণমাধ্যমে প্রায়শই শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী নিপীড়নের কথা শোনা যায়। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধেই যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আছে। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা ফেনীর নুসরাতের ঘটনাই এর জ্বলন্ত প্রমাণ। ছাত্রীরা যদি শিক্ষকের কাছে নিরাপত্তা না পায় তাহলে আর কোথায় পাবে? প্রশ্ন ফাঁস, আর্থিক কেলেঙ্কারি, জালিয়াতি, স্বজনপ্রীতিসহ বিভিন্ন নৈতিক স্খলনজনিত কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার সংবাদ পুরো শিক্ষক সমাজকেই লজ্জায় ফেলে দেয়। শিক্ষকগণের মধ্যে অনেক সময় দলীয় রেষারেষি এতটাই তীব্র হয়ে যায় যে একদিকে একাডেমিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে অন্যদিকে এসব সংবাদ প্রকাশিত হয়ে জনসাধারণের কাছে ভূলুণ্ঠিত করে শিক্ষকের মর্যাদা। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানদের দুর্নীতি, অনিয়ম এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে পত্রিকার পাতায় বিভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক কার্টুনও প্রকাশিত হচ্ছে। এ লজ্জা আমাদের সবার। শিক্ষকদের এরকম নানারকম অসংগতিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের কারণে দিনকে দিন শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সমাজের মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে। এই যে নৈতিক স্খলিত শিক্ষকগণের কথা বললাম, এমন শিক্ষকের সংখ্যা কিন্তু খুব বেশি নয়। এখনো অসংখ্য আদর্শ শিক্ষক সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আছেন, যারা জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান সৃজন এবং তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছেন, আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। এদের জন্যই এখনো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সচল রয়েছে। তবে দিনকে দিন যেভাবে বাইচান্স শিক্ষক হওয়ার নজির বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা যদি নিয়ন্ত্রণ করার কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাতে অদূর ভবিষ্যতে জাতি হিসেবে আমাদের মেরুদণ্ড বলে আর কিছু থাকবে না।
অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বিনা কারণে কিংবা সামান্য অজুহাতে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। যেখানে শিক্ষকগণ নিয়মিতই সামান্য বেতনভাতা পান না, সেখানে পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথা কল্পনাও করা যায় না। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণও নানারকম বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। শিক্ষা ক্যাডারের সঙ্গে অন্যান্য ক্যাডারের সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে তীব্র বৈষম্য বিরাজ করছে। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা পদোন্নতি, প্রশিক্ষণসহ নানারকম সমস্যায় ভুগছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। আগে চারটি ফার্স্ট ক্লাসের জন্য চারটি ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হতো কিন্তু অষ্টম পে স্কেলের পর এই ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অথচ সরকারি কর্মকর্তারা ঠিকই ফার্স্ট ক্লাসের জন্য ইনক্রিমেন্ট পাচ্ছেন। দীর্ঘদিন যাবত্ শিক্ষকরা স্বতন্ত্র পে-স্কেলের জন্য বলে আসছেন কিন্তু এ বিষয়টিকে গুরুত্বই দেওয়া হচ্ছে না। সম্প্রতি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব দেওয়াটাই প্রমাণ করে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের মর্যাদা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে কতটা উদাসীন। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক সর্বোচ্চ পদগুলোতে যোগ্য ও আদর্শ শিক্ষকদের বসানোর কোনো বিকল্প নেই; যাঁরা মেরুদণ্ড সোজা রেখেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিচালনা করবেন। তাছাড়া সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। সেই সঙ্গে শিক্ষকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদার নিশ্চয়তা বিধান করাসহ যাবতীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। আবার শিক্ষকগণকেও তার পেশার প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল হতে হবে। তাহলেই জাতি হিসেবে আমরা এই লজ্জার হাত থেকে মুক্তি পাব। বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রত্যাশা—এই লজ্জা থেকে মুক্তি পাওয়া।
n লেখক : শিক্ষক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
