আজারবাইজান-আর্মেনিয়া সংঘাত

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২০, ২১:৪৮

গত ২৭ সেপ্টেম্বর হঠাত্ করে যুদ্ধে জড়িয়েছে ঐতিহাসিকভাবে দুই শত্রু দেশ আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া। আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে নাগার্নো-কারাবাগ অঞ্চল নিয়ে বিরোধ জটিল ও দীর্ঘদিনের। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী গ্রুপ ‘মিনস্ক’ দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতার চেষ্টা করলেও কাঙ্ক্ষিত সফলতার মুখ দেখেনি। আজারবাইজান-আর্মেনিয়া সংঘাতে ফ্রান্স রাশিয়া ইরানের উচ্চৈঃস্বরের পাশাপাশি আজারবাইজানের পক্ষে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে তুরস্ক। কারণ আজারবাইজানে রয়েছে তুরস্কের ভূ-রাজনৈতিক, জ্বালানি ও কৌশলগত স্বার্থ। অন্যদিকে সাবেক সোভিয়েতভুক্ত আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য মিত্রতা বজায় রাখা রাশিয়ার জন্য এই সংঘাত অপ্রস্তুত পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার সংঘাত প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো। আজারবাইজানের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল নাগার্নো কারাবাগ আন্তর্জাতিকভাবে আজারবাইজানের অংশ; কিন্তু ৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চলের ৯১ শতাংশ অধিবাসী আর্মেনীয়। সোভিয়েত শাসনামলে যখন নাগার্নো কারাবাগকে আজারবাইজানের অংশ করা হয় তখন থেকেই তারা আজারবাইজানের কর্তৃত্ব মানেনি। সোভিয়েতের দুর্বল পরিস্থিতি ও দুই দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান হলে ১৯৮০ সালের দিকে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া নাগার্নো ও কারাবাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুদ্ধে জড়ায়। যুদ্ধে আজারবাইজানের পরাজয় নাগার্নো কারাবাগ অঞ্চলে আর্মেনীয় কর্তৃত্ব দৃঢ় করে। নাগার্নো কারাবাগ অঞ্চলের আর্মেনিয়ার সঙ্গে কোনো সীমান্ত ছিল না। মূলত এটা একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো যার চারপাশে আজারবাইজান; কিন্তু সে যুদ্ধে নাগার্নো কারাবাগ ও আর্মেনিয়ার মধ্যবর্তী ভূমি দখল করে নেয় আর্মেনীয়রা। ১৯৯৪ সালে যুদ্ধের পরে নাগার্নো কারাবাগ অঞ্চলে স্থানীয়রা নিজেদের স্বাধীন দাবি করে ‘অর্তিসাখ প্রজাতন্ত্র’ নামে একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলে। যদিও বা আর্মেনীয় আজারবাইজান দুই দেশ স্বতন্ত্র অঞ্চল নয় বরং নিজেদের অংশ দাবি করে নাগার্নো কারাবাগ অঞ্চলকে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে চলমান যুদ্ধে দুই পক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা বলা হচ্ছে। আজারবাইজান দাবি করছে তারা অর্তিসাখের সাতটি গ্রাম দখল করে নিয়েছে। তবে এই যুদ্ধের ভয়াবহতা ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে বিশ্বনেতাদের। এই সংঘাত দীর্ঘ হলে ককেশাস অঞ্চলে বিশ্ব শক্তিদের হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে এখানে রাশিয়ার একক প্রভাব ক্ষীণ হয়ে পড়ার একটা ঝুঁকি আসবে। আজারবাইজানের পক্ষে তুরস্কের সামরিক ও কূটনেতিক অবস্থান ককেশাস অঞ্চলে তুরস্ককে রাশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত করতে পারে।

তুরস্কের সঙ্গে আজারবাইজানের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক ঐক্য রয়েছে। দুই দেশ ‘এক জাতি দুই দেশ’ নীতিতে বিশ্বাসী। আজারবাইজান ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা বহুমাত্রিক। ১৯১৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্ব রাজনীতির নানা উত্থানপতনে আজারবাইজানকে সমর্থন দিয়ে এসেছে তুরস্ক। বর্তমানে তুরস্কের এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি চাহিদা মিটায় আজারবাইজান। ২০২১ সালে তুরস্ক-রাশিয়া জ্বালানি চুক্তি শেষ হচ্ছে। তারপরে হয়তো আরো ব্যাপকমাত্রায় আজারবাইজান থেকে জ্বালানি কিনতে চায় তুরস্ক। আজারবাইজান যদি ট্রান্স আনাতোলিয়ান পাইপলাইন ব্যবহার করে নিজেদের তেল-গ্যাস ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি করতে চায় তাও তুরস্কের ভূমির ওপর দিয়ে যেতে হবে।

রাশিয়ার আর্মেনিয়ার মিত্রতা ঘনিষ্ঠ হলেও দুই দেশে অস্ত্র বিক্রি করে রাশিয়া। ককেশাস অঞ্চলে রাশিয়ার নীতি হলো ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। এছাড়া রাশিয়ায় ২০-৩০ লাখ আজেরি ও সমসংখ্যক আর্মেনীয় বাস করে। ফলে রাশিয়া সরকারের কাছে এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে যাওয়া কঠিন। আর্মেনিয়া রুশ নেতৃত্বাধীন যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সংস্থার সদস্য। ফলে আর্মেনিয়ার পাশে থাকার চাপ আছে রাশিয়ার ওপর; কিন্তু আর্মেনিয়ার পক্ষে রাশিয়া হস্তক্ষেপ করলে আজারবাইজান আরো ব্যাপকমাত্রায় তুরস্কের ওপর নির্ভর হয়ে পড়বে। আজারবাইজানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের দেশ হাতছাড়া করতে চাইবে না রাশিয়া। এছাড়া ইতিমধ্যে সিরিয়া ও লিবিয়ায় রাশিয়া-তুরস্ক মুখোমুখি। ফলে নতুন করে ককেশাস অঞ্চলের দুই দেশের মধ্যে প্রক্সি-যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যাওয়া দুই দেশের সম্পর্কে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে উত্তর সিরিয়া, উত্তর ইরাক, লিবিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়া তুরস্কের পক্ষে আরেকটি প্রক্সি-যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যাওয়াও কঠিন। ফলে দুই দেশ নিজেদের স্বার্থে চলমান যুদ্ধের একটা ইতি টানানোর চেষ্টা করবে; কিন্তু আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের শত বছরের সংঘাতের কোনো কূটনৈতিক সমাধান আশা করা দুরূহ।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়