প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২০, ২১:৪৯

নতুন প্রজন্মের শিশুদের যেখানে জ্ঞানে-গুণে উন্নততর চর্চা করা উচিত, সেখানে শিশুরা জন্মের উষালগ্ন থেকেই জড়িয়ে পড়ছে আধুনিক প্রযুক্তির বেড়াজালে। আমরা শৈশব দেখেছি ভোরের পাখির কলতান কিংবা সোনালি আভা নিয়ে ছড়িয়ে পড়া সূর্যের রশ্মিতে; কিন্তু আজকের প্রজন্মের শিশুদের দিন শুরু হচ্ছে অন্ধকার জানলা-দরজা বদ্ধ কামরার মোবাইলের স্ক্রিনে। ফলস্বরূপ একদিকে তারা খুঁজে পাচ্ছে না প্রকৃতির মলিনতা অন্যদিকে বঞ্চিত হচ্ছে পরিবার-পরিজনের ভালোবাসার মধুর মিলন থেকে। এদের জীবন-যৌবন সবকিছুই একটা ছোট ডিজিটাল ডিভাইসের মধ্যে। যেমন একটা খাঁচায় বদ্ধ পাখি ডানা ঝাঁপটানোর পরেও একই অবস্থানেই থেকে যায় ঠিক তেমনি আবদ্ধ এই বর্তমান প্রজন্মের নবজাতক।

একসময় ছিল বিকালের আলো গড়াতে না গড়াতেই খেলার মাঠগুলোতে ছোটাছুটিতে মেতে থাকত শিশু-কিশোররা। ফুটবল, ক্রিকেট, গোল্লাছুট, কাবাডি, দাঁড়িয়াবান্ধা, ডাংগুলি, মার্বেলসহ নাম না জানা কত-শত বিনোদনে পূর্ণতা পেত গোধূলির সময়টা। স্কুল-কলেজে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে সহপাঠীদের সঙ্গে আড্ডা, দৌড়াদৌড়ি, দুষ্টুমিই ছিল শিশুকিশোরদের নিত্যদিনের আনন্দ। সকাল-সন্ধ্যায় গল্পের বইয়ে ডুব দেওয়া, বড়দের সঙ্গে সঙ্গে বাইরে ঘুরতে যাওয়া, প্রবীণদের কাছ থেকে গল্প শোনা ছিল তাদের কাছে এক ভিন্ন রকম অভিজ্ঞতা। সময়ের পরিক্রমায় আজকে যেন সবই হারিয়ে যেতে বসেছে। এসবের জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ট্যাব আর ল্যাপটপের মতো আধুনিক সব প্রযুক্তি। যেখানে কথিত আছে যে প্রযুক্তি আমাদের জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনার কথা, সেখানে এই অবশ্যম্ভাবী প্রযুক্তিই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু, কিশোর ও তরুণদের জন্য। মুঠোফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটার নিয়ে অতি ব্যস্ত হয়ে থাকছে শিশু-কিশোর, তরুণদের একাংশ। পড়াশোনা করবে ফোনের মাধ্যমে, খাবার হাতের মুঠোই পাবে ফোনের মাধ্যমে, আত্মীয়তা রক্ষা করবে ফোনের মাধ্যমে, এমনকি বিয়ের জন্য পাত্রপাত্রী খুঁজতেও ফোনের জুড়ি নেই। বর্তমান সময়ের উল্লেখযোগ্য হাস্যকর একটি ব্যবস্থা হচ্ছে মুঠোফোন বিবাহ। যেখানে আমাদের বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি অবাধে একসঙ্গে কাটিয়ে দিয়েছে ৫০-৬০ বছর, কিন্তু আমরা? বছর অতিক্রান্ত হবে তার নিশ্চয়তাটুকু নেই। আমাদের ব্যস্ত জীবনের সর্বস্তরে ছেঁয়ে গেছে এই প্রজন্মের অমোঘ হাতিয়ার মুঠোফোন। কেউ মুঠোফোন বা ল্যাপটপে গেমস খেলে। এই গেমসের আসক্তির ফলে আলমডাঙ্গা রেললাইনে বসে মোবাইল গেম ফ্রি ফায়ার খেলার সময় খুলনাগামী একটি ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে ওয়ালিদ হোসেন বিদ্যুত্ (১৮) নামের এক কিশোর।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ও শিক্ষাবিদ ড. মো. কায়কোবাদ বলেন, ‘এত বেশি প্রযুক্তিনির্ভরতা সমাজে একটা বিরূপ প্রভাব ফেলবে। কারণ, এই শিশুরা মানুষের সঙ্গে মিশতে না শিখে বরং ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে সময় কাটানো শিখছে। সে মানবিক সমাজে না বেড়ে বরং সাইবার সমাজের মধ্যে বড় হচ্ছে। তাদের মধ্যে প্রাকৃতিক হূদয় স্থাপিত হওয়ার বদৌলতে স্থান পাচ্ছে পৈশাচিক মনুষ্য তৈরির হূদয়। ফলে তৈরি হচ্ছে পাশবিক ঐশীর মতো হাজারো ছেলেমেয়ে, যারা অবলীলায় ঠান্ডা মস্তিষ্কে হত্যা পর্যন্ত করে ফেলছে জন্মদাত্রী পিতা-মাতা, ভাইবোন, দাদা-দাদি, নানা-নানিকে।

প্রযুক্তি আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু বাস্তবিক আনন্দ-বেদনার স্পর্শ কি ঠিক আগের মতোই আছে? আজ কিন্তু তারা আধুনিক, তবে শিক্ষিত নয়। তাদের মেধার বিকাশ হচ্ছে কিন্তু আত্মার পরিপুষ্টি সাধন নেই বললেই চলে। কেননা প্রাকৃতিক আর কারিগরি বিনোদনের মধ্যে থেকে যায় আকাশ-পাতাল ফারাক। না তারা জীবনের পথে একজন সফল পথিক তৈরি হচ্ছে আর না বাস্তবতার সম্মুখীন হওয়ার সাহস সঞ্চয় করতে পারছে। ঘরবন্দি থাকতে থাকতে এক সময়ে বের হচ্ছে পোলট্রি মুরগির মতো ঝিমধরা মনুষ্য দেহ। এটা কি আগামী দিনের ধ্বংসের জন্য অল্প অল্প সঞ্চয় নয়? কিন্তু তাই বলে প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার বন্ধ নয় বরং ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। পরিবারের ছোটদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখা গেলে, প্রযুক্তি ও অনলাইনের প্রতি আসক্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এতে করে তারা খেলাধুলা করে আনন্দও পাবে আর শরীরও সুস্থ থাকবে। এছাড়া শিশুরা সাধারণত অনুকরণপ্রিয় হয়। তাই অভিভাবকদের নিজেদের কার্যকলাপ নিয়েও বাচ্চাদের সামনে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই স্মার্ট হয় না, প্রযুক্তির অভিশাপ থেকে নিজে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখাই হলো প্রকৃত স্মার্ট।

n  লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়