বিবস্ত্র করে গৃহবধূ নির্যাতন

নোয়াখালীর ঘটনায় বিক্ষুব্ধ সারা দেশ

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২০, ০০:৪২

‘ও আব্বারে, তোগো আল্লাহর দোহাই রে। ভাইরে, আল্লাহর দোহাইরে। হাত দিস না আব্বারে।’ বখাটেদের হাতে বিবস্ত্র হওয়া এক মায়ের লজ্জা নিবারণের এমন আর্তিতে ঐ নরপশুদের মন গলেনি। এসব নরপশু বীরদর্পে বলতে থাকে, ‘ফেসবুকে দে- ফেসবুক। লাইট করি দে’।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামের ঐ গৃহবধূর এমন আর্তনাদ সারা দেশকে লজ্জায় ঢেকে দিয়েছে। ঘৃণা আর ক্ষোভে ফেটে পড়েছে সারা দেশ। নরপশুদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে দেশ জুড়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ আর মানববন্ধন হয়েছে। রবিবার রাতে এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে র্যাব দুই জন এবং নোয়াখালী থেকে পুলিশ দুই জনকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে দুই জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। এর আগে রবিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে ভুক্তভোগী ঐ নারী বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে বেগমগঞ্জ থানায় ৯ জনকে আসামি করে দুটি মামলা দায়ের করেন।

নোয়াখালী প্রতিনিধি আলমগীর ইউসুফ জানান, নির্যাতিত গৃহবধূর দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলো—বাদল (২২), রহিম (২০), আবুল কালাম (২২), ইস্রাফিল হোসেন (২২), সাজু (২১), সামছুদ্দিন ওরফে সুমন (৩৯), আবদুর রব ওরফে চৌধুরী মিয়া (৪৮), আরিফ (১৮) ও রহমত উল্যা (৪১)। এছাড়া অজ্ঞাতনামা সাত-আট জনকে আসামি করা হয়েছে। সোমবার পর্যন্ত এ ঘটনায় জড়িত চার জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও র্যাব। এর মধ্যে নোয়াখালী জেলা পুলিশ রবিবার সন্ধ্যায় ও রাতে বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের আবদুর রহিম ও রহমত উল্যাহকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত এই দুই জনকে গতকাল বিকালে পুলিশ আদালতে হাজির করে দুই মামলায় সাত দিন করে ১৪ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে। জেলার ৩ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মাশফিকুল হক শুনানি শেষে প্রত্যেকের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

নোয়াখালী জেলা পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ভুক্তভোগী ঐ গৃহবধূ এক পিরের দরবারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন। তিনি একটি পরিত্যক্ত বাসায় থাকতেন। তার স্বামী লঞ্চে চাকরি করেন। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ছেলে তার কাছে থাকেন। ঘটনার পর ভুক্তভোগী নারী ঐ গ্রাম থেকে চলে যান। এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বা মেম্বারের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। বিষয়টি গ্রামবাসী পুলিশকে জানায়নি। রবিবার সন্ধ্যার দিকে ভিডিওটি পুলিশের নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তদন্তে নেমে অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু করে। পরে রাতেই ভুক্তভোগী নারীকে অনুরোধ করে থানায় মামলা দায়ের করানো হয়। মামলার বাকি আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে।

মামলার এজাহারে নির্যাতিতা ঐ নারী উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন পর তার স্বামী বাপের বাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। গত ২ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে শয়নকক্ষে তারা স্বামী-স্ত্রী অবস্থান করছিলেন। এ সময় আসামিরা দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে তার স্বামীকে মারধর করে পাশের কক্ষে নিয়ে বেঁধে রাখে। একপর্যায়ে আসামিরা তাকে বিবস্ত্র করে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। এ সময় আসামিরা তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালায় এবং মোবাইল ফোনে ভিডিওচিত্র ধারণ করে। নির্যাতনকালে তার আর্তচিত্কারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে আসামিরা তাদের কাউকে কিছু না জানানোর জন্য শাসিয়ে হত্যার হুমকি দেয়। তাকে নির্যাতন করে চলে যাওয়ার পর তিনি ভয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে জেলা শহর মাইজদীর হাউজিং এস্টেটে তার এক বোনের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানে থাকা অবস্থায় আসামিরা মোবাইল ফোনে তাকে কুপ্রস্তাব দেয়। তিনি রাজি না হলে অশ্লীল ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়।

এ মামলায় আসামির তালিকায় দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ারের নাম না থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। দেলোয়ারকে এ মামলায় কেন আসামি করা হয়নি, সে বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন বলেন, ঐ নির্যাতিত নারী দেলোয়ারের নাম উল্লেখ না করায় মামলার আসামি করা যায়নি। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।

দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান গ্রেফতার : দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ারকে সোমবার ভোরে র্যাব অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করেছে। র্যাব-১১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম সোমবার দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শিমরাইল এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করার সময় একটি পরিবহন থেকে দেলোয়ারকে দুইটি গুলি ভর্তি পিস্তলসহ গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঢাকার কামরাঙ্গীরচর থেকে মামলার প্রধান আসামি বাদলকে গ্রেফতার করা হয়। তাদেরকে বেগমগঞ্জ থানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম বলেন, দেলোয়ার বাহিনী ঐ এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। দেলোয়ার এলাকায় অস্ত্রধারী চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তাদের ভয়ে এলাকার লোকজন ভীতসন্ত্রস্ত থাকে। দেলোয়ারের বিরুদ্ধে দুটি চাঁদাবাজির মামলা আছে। তিনি বলেন, ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পেছনে কাদের হাত আছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে জানতে গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

সারা দেশে ক্ষোভ বিক্ষোভ :‘এভাবে নারীদের সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলতে পারে না। তাই বাধ্য হয়ে ধর্ষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছি। ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’ এভাবেই বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী পলি কর্মকার। সোমবার দুপুরে রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ কর্মসূচি পালনের সময় এই শিক্ষার্থীসহ আরো অনেকে প্রায় অভিন্ন ভাষায় ক্ষোভ জানান। এ সময় সেখানে তার মতো আরো অনেক শিক্ষার্থী ছাড়াও বামপন্থি কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সম্মিলিত ছাত্র-জনতা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া একই দাবিতে গতকাল রাজধানীর উত্তরা, নারায়ণগঞ্জ ও নোয়াখালীসহ সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। সেখানেও একই ধরনের দাবি জানানো হয়। বিভিন্ন ধরনের পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। এ সময় কারো হাতে থাকা পোস্টারে লেখা ছিল, ‘ছি, রাষ্ট্র’। আবার কারো হাতে ছিল, ‘রুখে দাঁড়াও আমার বোন, ধর্ষণের বিচার চাই...’ ইত্যাদি ইত্যাদি। দুপুর ১২টা থেকে অবস্থান কর্মসূচি উত্তাল হতে শুরু করে। পাশাপাশি জাতীয় জাদুঘরের সামনে ও শাহবাগ মোড় অবরোধ করে স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা।

অবস্থানের প্রথম দিকে শাহবাগ এলাকায় যান চলাচল বন্ধ থাকায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে কিছু সময় পর ধীরগতিতে যান চলাচল করতে দেন বিক্ষোভকারীরা। এ সময় অবস্থান কর্মসূচির আশপাশে অবস্থান নেয় পুলিশ। তবে শাহবাগ প্রধান সড়কের মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি চললেও পুলিশ এক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করেনি। এতে সাধারণ মানুষ অনেক ভোগান্তির মধ্যে পড়ে।

জাতীয় জাদুঘরের সামনে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সমাবেশে মাকসুরা আক্তার বলেন, সরকারকে বুঝতে হবে এভাবে আর চলতে পারে না। মা-বোন সুরক্ষা পাচ্ছেন না। কেন আমার মা-বোনরা একে একে ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন, ধিক্কার জানাই এসব ঘটনার।’

ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি জহর লাল রায় বলেন, কোনো ধর্ষণের ঘটনা ভাইরাল হলেই সেটি নিয়ে আলোচনা হয়, লোক দেখানো গ্রেফতার হয়। কিন্তু বিচার চলে বছরের পর বছর। এর ফাঁকে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ধর্ষকরা জেল থেকে বেরিয়ে যায়। আমরা এ দৃশ্য আর দেখতে চাই না। সমাবেশে শ্রমিক অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুর রহমান বলেন, ‘২০১৮ সালে সুবর্ণচরে নারী ধর্ষণের ঘটনার বিচার হয়নি। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এই রাষ্ট্রে ধর্ষণের বিচার হয় না।’

নোয়াখালীতে বিক্ষোভ :ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার সকাল থেকে জেলা শহর মাইজদীসহ বিভিন্ন উপজেলা সদরে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধনে উত্তাল হয়ে উঠে। নারী অধিকার জোট, সাধারণ শিক্ষার্থী, সমস্ত নোয়াখালীবাসী, ছাত্র ও যুব অধিকার পরিষদ, ফ্রেন্ডস গ্রুপ, এক চিলতে হাসির জন্য, ইয়ং স্টার সোশ্যাল অর্গানাইজেশন, ব্লাড হান্টার গ্রুপ ও ব্লাড ফোরাম, ইসলামি ছাত্র আন্দোলন, শাসনতন্ত্র আন্দোলন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রদলসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, নোয়াখালী প্রেসক্লাবের সামনে, টাউন হল চত্বরে ও প্রধান সড়কে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। কয়েকটি সংগঠন জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে।

ইত্তেফাক/এসআই