মাঠে নেই, তবু সবখানে আলোচনায় ট্রাম্প

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২০, ১৬:২৩

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর বাকী মাত্র ২৮ দিন। করোনা ভাইরাসের কারণে এবারের নির্বাচনে সরব প্রচারণা নেই। রিপাবলিকান প্রার্থী ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ তার পুরো প্রচার টিম করোনায় আক্রান্ত। তাদের কেউই এখন মাঠের প্রচারে নেই। জনপ্রিয়তার বিচারে ডেমাক্রেটিক প্রার্থী ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন অনেক এগিয়ে। কিন্তু নানান কৌশলে সবখানে-সারাক্ষণ আলোচনায় ট্রাম্প। তার সমালোচকেরা বলছেন, অর্থ ব্যয় না করে কীভাবে আলোচনায় থাকা যায়, সে কৌশল বেশ ভালভাবে রপ্ত করে ফেলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রেসিডেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ডে ২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় দুই প্রেসিডেন্টর প্রথম বিতর্ক। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ বিতর্ক হিসাবে পরিচিতি পায় অনুষ্ঠানটি। বিশেষ করে জো বাইডেনকে কথা বলতে না দেওয়ার বিষয়টি সর্বত্র সমালোচনা হয়। বাইডেন যখন আলোচনায়, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিতর্কের পরদিনই করোনা ধরা পড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শরীরে। পরে তার নির্বাচনী প্রচার টিমের ১১ জনের শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে ভাইরাসটি। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন ট্রাম্প। আবার পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই হোয়াইট হাউজে ফিরে যান তিনি।

করোনা ধরা পড়া, হাসপাতালে ভর্তি এবং বাসায় ফিরে যাওয়াসহ প্রায় প্রতিটি ঘটনা বিশ্বমিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার হয়। প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কের আগে ট্রাম্পের ৭৫০ ডলারের ব্যক্তিগত আয়কর দেওয়া এবং বিতর্ক অনুষ্ঠানের আচরণ চাপা পড়ে যায় মুহূর্তেই। এমনকী তার প্রতি তৈরি হয় সব মানুষের সহানুভ‚তি। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পের নেতিবাচক কর্মকাÐের বিরুদ্ধে যে প্রচারণা চলছিল তাও বন্ধ করে দেন প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থী জো বাইডেন। তিনি কর্মিদের নির্দেশ দেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একটি কথাও না বলার। অর্থ ব্যয় করে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যে বিজ্ঞাপন প্রচার চলছিল, তা-ও বন্ধ হয়ে যায় মুহূর্তেই। মূলতঃ ট্রাম্পের নানান কৌশলের কাছে যেভাবে পরাস্ত হচ্ছে ডেমোক্রেটিক রাজনীতি, সর্বশেষ ট্রাম্পের করোনা আক্রান্তের ঘটনাটি একটি কৌশল ছিল, মাঠপর্যায়ের ডেমোক্রেট সমর্থকরা এমনটিই বলছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) গাইডলাইন অনুসারে করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি ন্যুনপক্ষে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। করোনায় এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে দুই লাখেরও বেশী মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অথচ ৭৪ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি হয়েও মাত্র তিন দিন পর বাসায় ফিরে গেছেন। হাসপাতালে থেকে ওভাল অফিসের জন্য কাজ করেছেন। হোয়াইট হাউজে ফিরেই তিনি মুখের মাস্ক খুলে ফেলেন। যে ভাইরাস দেশটির দুই লাখেরও বেশী মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, ৯টি রাজ্যে দ্বিতীয় দফায় করোনার সংক্রমণ বাড়ছে, অথচ ট্রাম্প বাসায় ফিরেই মুখ থেকে মাস্ক খুলে বেপরোয়াভাবে বলেই ফেললেন, ‘করোনাভাইরাসকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’ এর মাধ্যমে ট্রাম্প নিজেকে একজন করোনা যোদ্ধা হিসাবে আবিস্কার করতে চেয়েছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে হাসপাতাল ছেড়ে বাসায় ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল নন। করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা তার আছে। আরো চার বছর দেশ শাসন করতেও সক্ষম তিনি। অথচ পুরো হোয়াইট হাউজেই এখন ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। সর্বশেষ ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি কেইলি ম্যাকইনানিও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

সিএনএন এক জরিপে জানিয়েছে, ট্রাম্প তার স্বাস্থ্যের বিষয়ে বরাবরই দায়িত্বহীন ছিলেন। তিনি হোয়াইট হাউজে থেকে করোনার ব্যাপারে অবিশ্বাস্য অভিনয় করেছেন। একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে গত ছয় মাসে ট্রাম্পের দায়িত্বহীন কর্মকাÐে লাখ লাখ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৯ শতাংশ আমেরিকান বলেছেন যে তারা প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্যের বিষয়ে হোয়াইট হাউসের কাছ থেকে যা শুনেছেন, তার মধ্যে খুব কমই ভরসা করেছেন। মাত্র ১২ শতাংশ বলেছেন যে তারা এর প্রায় সবটিতেই আস্থা রেখেছিলেন।

এদিকে আগামী ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় বিতর্ক। এটি অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা রাজ্যের মিয়ামি আদ্রিয়ান পারফরমিং অব আর্টস সেন্টারে। সি-স্প্যানের পলিটিক্যাল এডিটর স্টিভ স্কালি এদিন সঞ্চালকের ভ‚মিকায় থাকবেন। বিতর্কের অন্তত এক সপ্তাহ আগে বিষয়বস্তু নির্ধারণ করার কথা রয়েছে। টাউন হল মিটিংয়ের মত করে বিতর্ক অনুষ্ঠানটির আয়োজন চলছে। সাউথ ফ্লোরিডার দোদুল্যমান ভোটাররা এদিন বিতর্কে অংশ নিতে পারেন এবং তাদের প্রশ্ন করারও সুযোগ থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ভোট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার ভোটাররা যে রায় দেন তার ওপর নির্ভর করে হোয়াইট হাউজের পরবর্তী বাসিন্দা কে হবেন। রাজ্যটিকে দোদুল্যমান ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। তবে ট্রাম্পের করোনা আক্রান্ত হওয়া এবং হাসপাতালে অবস্থান অগ্রাহ্য করে বাসায় ফিরে যাওয়ার বিষয়টি বিতর্কে প্রশ্ন হিসাবে আসতে পারে। প্রথম বিতর্কে প্রতিপক্ষের বক্তব্যে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠায় পুনরাবৃত্তি রোধে এই বিতর্কে মাইক বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এসেছে। ট্রাম্প এটি না মানারও ঘোষণা দিয়েছেন। দ্বিতীয় এই বিতর্কের দৃশ্যপট কী হতে পারে, কী কাÐ ঘটিয়ে আলোচনায় থাকবেন ট্রাম্প, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন আমেরিকানরা, এমনকী বিশ্ববাসীও।

ইত্তেফাক/আরএ