ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে নৌ চলাচল ‘অবাধ ও স্বাধীন’ রাখার উপায় খোঁজার যুক্তি দেখিয়ে ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মধ্যে কোয়াড নামে সংলাপের সূচনা হয়। এর আওতায় ঐ চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টোকিওতে মঙ্গলবার থেকে দুদিনের বৈঠকে বসছেন। খবর বিবিসির।
১০ বছর থমকে থাকার পর কোয়াড সংলাপ ২০১৭ সাল থেকে নতুন করে জীবন ফিরে পেলেও সম্প্রতি টোকিওর এই বৈঠক নিয়ে এক বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এর প্রধান কারণ এই বৈঠকটি এমন এক সময় হচ্ছে যখন সীমান্ত নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে প্রায় চার মাস ধরে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এদিকে, প্রধান বৈরী এই চার দেশের মধ্যে বৈঠককে কেন্দ্র করে চীন বেশ উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ। মঙ্গল ও বুধবার টোকিওতে কোয়াডের এই বৈঠক চলার সময় একই সঙ্গে তিন থেকে চারটি নৌ এবং বিমান মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে বেইজিং। কোয়াডের চারটি সদস্য দেশের মধ্যে ২০১৭ সাল থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। কিন্তু চীনকে আটকাতেই যে এই জোটবদ্ধ উদ্যোগ, পরিষ্কার করে তা কখনো-ই বলা হয়নি।
এমনকি এসব বৈঠক নিয়ে এই চারটি দেশের সরকারের পক্ষ থেকে জনসমক্ষে যেসব ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বা যেসব নথিপত্র চালাচালি হয়েছে, তার কোথাও চীন শব্দটিই নেই। কিন্তু অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, টোকিও বৈঠকে তা বদলে যেতে পারে। কারণ যে দেশটি এই প্ল্যাটফরমকে প্রকাশ্যে ‘চীন-বিরোধী’ তকমা দিতে সবচেয়ে বেশি কুণ্ঠিত ছিল সেই ভারত তাদের অবস্থান অনেকটাই বদলে ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা র্যান্ড করপোরেশনের সাম্প্রতিক এক প্রকাশনায় সাউথ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ডেরেক গ্রসম্যাস লিখেছেন, পরিস্থিতি এখন অন্যরকম। কারণ, এই চার দেশের সবাই এখন চীনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের প্রশ্নে একমত।
তিনি বলেন, ২০০৭ সালে কোয়াড প্ল্যাটফরমকে একটি প্রতিরক্ষা জোটে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা ভেস্তে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল চীনকে নিয়ে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার আড়ষ্টতা। চীনকে কতটা কোণঠাসা করা উচিত তা নিয়ে এই দুই দেশের মধ্যে দ্বিধা ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তারা সবাই একমত। তিনি বলেন, বিশেষ করে আমার সবসময় মনে হয়েছে কোয়াডে দুর্বল ছিল ভারত। কিন্তু ভারত মনে হয় তার অবস্থান বদলে ফেলছে। এখন মনে হচ্ছে চারটি দেশই চীনের বিষয়ে একমত।
দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদোয়াজও মনে করেন, ভারতের বর্তমান সরকারের মধ্যে এখন এমন বিশ্বাস দিনকে দিন দৃঢ় হচ্ছে যে, কেবলমাত্র সামরিক শক্তির ভয় দেখিয়েই চীনকে সামলানো সম্ভব। তিনি বলেন, ভারতের বর্তমান সরকার মনে করছে, চীন ভারতের ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব হুমকিতে ফেলছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের স্বার্থ-প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং এ থেকে চীনকে বিরত রাখতে হলে শক্তির ভয় দেখানো ছাড়া বিকল্প নেই।
তার মতে, অন্য দেশের সঙ্গে কোনো সামরিক বা প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে ভারত এখন প্রস্তুত। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ভরদোয়াজ গত সপ্তাহে কোয়াড সম্পর্কে ভারতের প্রতিরক্ষা প্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াতের এক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টানেন।
বৃহস্পতিবার এক বক্তৃতায় জেনারেল রাওয়াত বলেন, ভারত মহাসাগর অঞ্চলে এবং আশপাশের অন্যান্য মহাসাগরে আতঙ্ক-উসকানি ছাড়া চলাফেরা, অন্য কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে চ্যালেঞ্জ করতে কোয়াডের গুরুত্ব অনেক।
তিনি আরো বলেন, সাগরে এবং আকাশে অবাধ গতিবিধি নিশ্চিত করতে ভারত উদগ্রীব। কোনো দেশের নাম তিনি উল্লেখ করেননি। তবে জেনারেল রাওয়াত এখানে চীনের কথাই বলেছেন সেটা স্পষ্ট। তবে ভারতের এই অবস্থান যে রাতারাতি বা গত জুন মাস থেকে তৈরি হয়েছে তা নয়। গত দশকের মাঝামাঝি থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন।
