ড. মো. তাসদিকুর রহমান
তুলা একটি আন্তর্জাতিক মানের শিল্প ফসল, যা বিশ্বব্যাপী ‘সাদা সোনা’ হিসাবে পরিচিত। তুলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঐতিহ্য, ইতিহাস, সভ্যতা, অর্থনীতি। এটি আমাদের দ্বিতীয় মৌলিক চাহিদা—জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তুলার তৈরি বস্ত্র প্রয়োজন। বিশ্বে প্রায় ৭৫টি দেশে তুলা চাষ করা হয়। তুলা উত্পাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ৪০তম এবং তুলা আমদানিকারক দেশ হিসাবে দ্বিতীয়।
তুলা থেকে আঁশ ছাড়াও ভোজ্য তেল, খৈল, জ্বালানি উপজাত হিসাবে পাওয়া যায়। ভোজ্য তেলে খুব কম কোলেস্টরেল থাকে এবং তুলার বীজ থেকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ তেল পাওয়া যায়, যা উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ এবং সয়াবিন তেলের চেয়েও পুষ্টিকর। খৈলে রয়েছে উচ্চ প্রোটিন ২৪ শতাংশ, উচ্চ ফ্যাট ২০ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশ ক্রুড আঁশ—যা পশু ও মত্স্য খাদ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
তুলার ইতিহাস পৃথিবীতে ৭০০০ বছরের পুরাতন। আর্য যুগ থেকে ব্রিটিশ আমলের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের ঘরে ঘরে কার্পাসের চাষ হতো, ঘরে ঘরে চরকায় সুতা তৈরি হতো, তাঁতিরা কাপড় বুনে দেশের চাহিদা মেটাত। বিশ্ববিখ্যাত মসলিন কাপড় ও অন্যান্য সুতি বস্ত্র সমগ্র ইউরোপে রপ্তানি হতো। ম্যানচেস্টারের কাপড় বাংলাদেশি কাপড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠতে পারত না বলে ইংল্যান্ডে বাংলাদেশি কাপড় নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল।
ড. আলি নওয়াজ তাঁর ‘খনার বচন, কৃষি ও বাঙ্গালী সংস্কৃতি’ বইতে জানাচ্ছেন, সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের উপনিবেশিক নীতির ফলে শুধু যে কার্পাস চাষ আর তাঁতশিল্পই ধ্বংস হলো তা নয়—এদেশের কৃষককে বাধ্য করা হলো তত্কালীন বিশ্বের কারখানা, ইংল্যান্ডের কলকারখানার জন্য কাঁচামাল প্রস্তত করতে। এর উদাহরণস্বরূপ নীল চাষের উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের তাঁতশিল্পকে ধ্বংস করে, তাঁতিদের বাড়ি বাড়ি সিপাহী বসিয়ে তাঁত চালানো বন্ধ রাখত। এ নিয়ে দুইবার তাঁতি বিদ্রোহ হয়েছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশের তুলা চাষ স্থানান্তর হয় ইংরেজদের নির্ভরযোগ্য উপনিবেশ আমেরিকায় আর আমেরিকার নীল চাষ আনা হয় বাংলা, বিহার, উড়িষ্যায়।
স্বাধীনতা আগে বাংলাদেশে কোনো তুলা উত্পাদন হতো না। সমস্ত তুলা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমদানি করা হতো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর তুলা উন্নয়ন বোর্ড গঠন করেন। পাট চাষের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে নেওয়া ৩২৫ জন চাষিকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে ৭৯৬ একর জমি তুলা চাষের জন্য বরাদ্দ করেন।
প্রাথমিকভাবে চাষ উপযোগী জমি নির্ধারণ করা হয়েছে ২.৫ লাখ হেক্টর এবং তুলার উন্নত জাত ও হাইব্রিড জাত তৈরির জন্য নেওয়া হয়েছে গবেষণা প্রকল্প, যা এর মধ্যে একনেকের অনুমোদন পেয়েছে। তাছাড়া বিটি কটনের ট্রায়াল সম্পন্নপূর্বক এ বছরে অনুমোদন পেতে যাচ্ছে চাষাবাদের জন্য। তুলাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক তন্তুর গবেষণা, সংরক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও তুলা চাষ সম্প্রসারণের জন্য একটি মেগা প্রকল্প তৈরির কাজ শুরু করেছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড। সমস্ত কার্যক্রম ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশেই ২০ লাখ বেল তুলা উত্পাদন ২০৪১ সালের মধ্যেই সম্ভব হবে।
তুলা বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
