বাংলাদেশের অমূল্য তারুণ্যশক্তির অপচয় হইতেছে। অন্তত সমসাময়িক চালচিত্র ও পরিসংখ্যান সেই কথাই বলিয়া থাকে। করোনা-পূর্ববর্তী একটি জরিপ হইতে জানা গিয়াছিল—দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশই কোনো কাজ করিতেছেন না, আবার পড়াশুনাও করিতেছেন না। সেই কারণে এই শ্রেণির মধ্যে বেকারত্বের হার অধিক। বর্তমানে ১৫ হইতে ২৯ বত্সর বয়সি ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ তরুণ-তরুণীর এমন অবস্থা। অর্থাত্ কাজেও নাই আবার পড়াশুনাও করিতেছেন না—এমন তরুণ-তরুণীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতেছে দিনদিন। করোনা আসিয়া সেই সমস্যাকে আরো প্রলম্বিত করিয়াছে। এমনিতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেই মার্চের শেষার্ধ হইতে বন্ধ। এইচএসসি পরীক্ষা সেই যে পিছাইয়াছে, তাহা কবে অনুষ্ঠিত হইবে, তাহা স্পষ্ট নহে। যদিও সরকার চেষ্টা করিতেছে একটি সমাধানের। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত রিপোর্ট হইতে জানা যায়, নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু করিবার ব্যাপারে প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেছে সরকার।
প্রকৃতপক্ষে, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষা এখন অবধি অনুষ্ঠিত না হওয়ায় বাংলাদেশের তারুণ্যশক্তির একটি বৃহত্ অংশ আরো অধিক অনিশ্চয়তায় পড়িয়াছে। কেবল ১৩ লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীর জীবন গভীর অনিশ্চয়তায় পড়ে নাই, ইহার সহিত বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ধারাবাহিকতায়ও জট লাগিয়া যাইতেছে। কারণ, উচ্চমাধ্যমিক হইল উচ্চশিক্ষার সাপ্লাই চেইন। করোনার কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী একরকম পাঠ্যবই-বিমুখ হইয়া রহিয়াছে। কারণ, পরীক্ষার প্রস্তুতির উত্তেজনা দিনের পর দিন ধরিয়া অনেকেই লইতে পারেন না। এইদিকে প্রথাগত প্রক্রিয়ায় বর্তমানে ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ায় আমাদের শিক্ষার মান যে আরো নিম্নগামী হইবে, তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। আমরা ইতিপূর্বে দেখিয়াছি যে, দেশে উচ্চশিক্ষা প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাইবার কারণে গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যাও অনেক গুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে বটে; কিন্তু দুঃখের সহিত বলিতে হয়, গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যার অনুপাতে ভালো মানের মানবসম্পদ তৈরি হইতেছে না। কেবল তাহাই নহে, স্বাধীনতার চার যুগ পরেও বাংলাদেশে কার্যত বহুজাতিক কোম্পানিগুলির ঊর্ধ্বতন সকল পদে বাংলাদেশি গ্র্যাজুয়েটরা নিজেদের খুব অধিক প্রতিষ্ঠিত করিতে পারেন নাই। এই সমস্যার একটি বড় কারণ হিসাবে মনে করা হয়, আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বড় কোনো লক্ষ্যের দিকে ধাবিত না হইয়া কোনোমতে একটি চাকরির পিছনে ছুটিয়া থাকেন। আর একটি চাকরি হইয়া গেলে নিজেকে উন্নত করিবার জন্য তাহাদের আর চেষ্টা করিতে দেখা যায় না।
এই বিষয়টি আমরা বারবার সম্মুখে তুলিয়া ধরিয়াছি যে, বাংলাদেশ এখন তারুণ্যের স্বর্ণযুগে বসবাস করিতেছে। ইউএনডিপির আঞ্চলিক মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে ইতিপূর্বে বলা হইয়াছে যে, বাংলাদেশ বর্তমানে তরুণদের দেশ। দেশের ৪৯ শতাংশ মানুষের বয়স ২৪ বত্সর বা তাহার নিচে। আর কর্মক্ষম মানুষ রহিয়াছেন সাড়ে ১০ কোটির অধিক—যাহা মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বড় সুযোগ আনিয়া দিয়াছে; কিন্তু আমরা কেন সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাইতে পারিতেছি না—ইহার বড় কারণ হিসাবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, মৌলিক শিক্ষার নিম্নমান এবং যুগোপযোগী কারিগরি শিক্ষার অভাব। অর্থাত্ দক্ষতা বিবেচনায় পিছাইয়া রহিয়াছে আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী।
আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রতিভা রহিয়াছে, তাহারা দেশের বাহিরে প্রায়শই দারুণ সকল সুনাম অর্জন করিয়া থাকেন; কিন্তু দেশের মধ্যে তাহারা সর্বোচ্চ মানে বিকশিত হইতে পারেন না অধিকাংশ সময়। এই অবস্থার উন্নতি বিধান করা জরুরি। নচেত্, অমূল্য তারুণ্যশক্তিকে কাজে লাগাইয়া দেশকে আরো অগ্রসর করিবার সুবর্ণ সুযোগ আমরা হেলায় হারাইব।
