নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নে পাশবিক নির্যাতনের শিকার ওই নারী দেলোয়ার হোসেন ও তাঁর সহযোগী আবুল কালামের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের করেছেন। মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটার দিকে বেগমগঞ্জ মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলাটি করা হয়।
মামলার এজাহারে অভিযোগ, ২ সেপ্টেম্বর দেলোয়ার বাহিনীর সদস্যরা বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনার আগে দেলোয়ার দুইবার ওই নারীকে ধর্ষণ করেছিলেন। এর মধ্যে একবার ধর্ষণ করা হয় প্রায় এক বছর আগে। আর দ্বিতীয়বার ধর্ষণ করা হয় রমজানের কিছুদিন আগে। দ্বিতীয়বার ধর্ষণের ঘটনার দিন দেলোয়ারের সহযোগী কালামও তাঁকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বেগমগঞ্জ মডেল থানার ওসি হারুনুর রশিদ চৌধুরী জানান, অনৈতিক কাজের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় গত ২ সেপ্টেম্বর দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার ও তার বাহিনীর সদস্যরা বসতঘরের দরজা ভেঙে নারীর ঘরে প্রবেশ করে তাকে ধর্ষণ চেষ্টা করে। ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে তাকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করে এবং ওই নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে। ওই ঘটনার বছর খানেক আগে দেলোয়ার নারীকে দুইবার অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ধর্ষণ করে। দ্বিতীয়বার ধর্ষণ করে এপ্রিলের শেষের দিকে। দ্বিতীয়বার ধর্ষণের সময় দেলোয়ার বাহিনীর সদস্য কালামও তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিল।
দেলোয়ারকে নারীর নির্যাতন মামলায় মঙ্গলবার শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছিল। ধর্ষণ মামলায়ও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে। এ মামলার অপর আসামি আবুল কালামসহ অন্যান্য আসামিদেরকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে রয়েছে।
রেড স্টার গ্যাং বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার :
পঞ্চম শ্রেণি পাশ করেই দেলোয়ার বেগমগঞ্জ এলাকায় বখে যাওয়া ছেলেদের তালিকায় নাম লেখায়। সমবয়সি ২০ জনকে নিয়ে গঠন করে ‘রেড স্টার’ গ্যাং বাহিনী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রেড স্টার গ্যাং’ নামে একটি পেজ খোলে। এই পেজে নতুন ভিডিও আপ করার জন্য নিজেরাই ঘটনা তৈরি করে তা ভিডিও করে। এই ভিডিও তাদের পেজে আপ করার সঙ্গে সঙ্গে লাখ লাখ লাইক পড়ে। একেকটি ভিডিওর কমেন্টস ও শেয়ারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। দেলোয়ার নিজেই বেগমগঞ্জ এলাকায় তরুণীদের ইভটিজিং করত। ইভটিজিং করার দৃশ্য তার বাহিনীর সদস্য দিয়ে ভিডিও করাত। ঐ ভিডিও তার রেড স্টার গ্যাং পেজে আপ করে দিত। এভাবে দেলোয়ার বাহিনী বেগমগঞ্জ এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তার বাহিনী বেগমগঞ্জ ও মাইজদী এলাকায় বড় টেন্ডারবাজ গ্রুপের সঙ্গে টেন্ডারবাজিতে মহড়া দেয়। মহড়া দেওয়ার সময় দেলোয়ার বাহিনীর লোকজন সেটা ভিডিও করে তা তাদের পেজে আপ করে দেয়।
ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, দখল এমনকি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েও দেলোয়ার বাহিনী ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা, বিভিন্ন সময়ে এমপির ছবি দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ে পোস্টারিং ছিল দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ারের রাজনৈতিক হাতিয়ার। আর এই হাতিয়ারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নানা অপকর্ম চালিয়ে এলেও পুলিশ কখনো এ বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। ১২টি ধর্ষণ, ৩টি হত্যাসহ দেলোয়ার ১৭ মামলার আসামি হয়েও কীভাবে বেগমগঞ্জ এলাকায় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন এ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিশেষ আশীর্বাদ থাকায় পুলিশ দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার ও তার গ্রুপের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কখনো ব্যবস্থা নিত না।
এর আগে, রবিবার (৪ আক্টোবর) দিবাগত রাত ১২টার দিকে ভুক্তভোগী ওই নারী বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দুটি দায়ের করেন।
মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন-বাদল (২২), মো. রহিম (২০), আবুল কালাম (২২), ইসরাফিল হোসেন (২২), সাজু (২১), সামছুদ্দিন ওরফে সুমন (৩৯), আবদুর রব ওরফে চৌধুরী মিয়া (৪৮), আরিফ (১৮) ও রহমত উল্যা (৪১)। আরও অজ্ঞাতনামা ৭-৮ আসামি করা হয়েছে।
জানা যায়, এ মামলায় দেলোয়ারকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার এ ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রকাশ পায়। ফলে আসামির তালিকায় তার নাম না থাকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে।
এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘নির্যাতনের শিকার ওই নারী দেলোয়ারের নাম উল্লেখ না করায় মামলার আসামি করা যায়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানিয়েছে এ ঘটনর মূল ইন্ধনদাতা দেলোয়ার। সে সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।’
মামলার এজাহারে নির্যাতনের শিকার ওই নারী উল্লেখ করেন, গত ২ সেপ্টেম্বর দীর্ঘদিন পর বাপের বাড়িতে তার স্বামী তার সাথে দেখা করতে যান। রাত ৯টার দিকে শয়ন কক্ষে স্বামী-স্ত্রী অবস্থান করছিলেন। এ সময় আসামিরা দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে তার স্বামীকে মারধর করে পাশের কক্ষে নিয়ে বেঁধে রাখে। একপর্যায়ে আসামিরা তাকে বিবস্ত্র করে ধর্ষণের চেষ্টা চালায় এবং আসামিরা তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালায় ও মোবাইল ফোনে ভিডিওচিত্র ধারণ করে। নির্যাতনকালে তার আর্তচিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসলে আসামিরা কাউকে কিছু না জানানোর জন্য তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে শাসায়। তাকে নির্যাতন করে চলে যাওয়ার পর তিনি ভয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে জেলা শহর মাইজদীর হাউজিং এস্টেটে তার এক বোনের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানে থাকা অবস্থায় আসামিরা মোবাইল ফোনে তাদের কুপ্রস্তাবে রাজি না হলে অশ্লীল ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। একপর্যায়ে রবিবার দুপুরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধারণকৃত ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বোনের বাসা থেকে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে পুলিশ। রাতে তিনি থানায় মামলা দায়ের করেন।
নির্যাতনের শিকার ওই নারীর বাবা বলেন, ‘ঘটনার সাথে জড়িতরা প্রভাবশালী হওয়ায় এতেদিন ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস পায়নি।” এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি।
ইত্তেফাক/এএম
