করোনার সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় ঢেউ লইয়া বিশ্ববাসী উদ্বিগ্ন। ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাহার প্রভাবও পড়িতে শুরু করিয়াছে। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, দ্বিতীয় দফায় করোনা আরো রুদ্রমূর্তি লাভ করিতে পারে। ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মতো দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতেছে অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক হারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক হান্স ক্লুজ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলিয়াছেন যে, ইউরোপে গত মার্চ মাসে করোনা মহামারির সংক্রমণ যখন চূড়ায় পৌঁছাইয়াছিল, তাহার চাইতেও বর্তমান পরিসংখ্যান খারাপ ইঙ্গিত দিতেছে। শীতকালে আমাদের দেশেও করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মারাত্মক আকার ধারণ করিতে পারে বলিয়া ইতিমধ্যে সতর্ক করিয়া দিয়াছেন প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এখনো আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণের হার প্রায় ১২.১৪ এবং মৃত্যুর হার ১.৩৯ শতাংশ। কিন্তু ইহাতেই আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগিবার কোনো কারণ নাই। দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে হইবে। এই প্রস্তুতির প্রধান দুইটি দিক হইল বিশ্বের যে কোনো দেশে কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হইলে সঙ্গে সঙ্গে তাহার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং করোনা মহাদুর্যোগ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি করা। গণসচেতনতায় প্রচারণার গুরুত্ব সবচাইতে অধিক।
প্রচারণা আমরা নানাভাবে করিতে পারি। এই ব্যাপারে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক ভূমিকা একান্ত প্রত্যাশিত। ইহার বাহিরে আরো একটি কার্যকর উপায় আমাদের সম্মুখে রহিয়াছে। তাহা হইল—আমরা যদি মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে সরকারি-বেসরকারিভাবে লিফলেট বিতরণ করিতে পারি এবং ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের এই ক্ষেত্রে কাজে লাগাইতে পারি, তাহা হইলে সমগ্র দেশেই ইহার ইতিবাচক ফল পাওয়া যাইবে। গত সোমবার ইসলামিক ফাউন্ডেশন দেশের প্রখ্যাত আলেম-ওলামাদের সহিত এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। বক্তারা করোনা প্রতিরোধে মসজিদকেন্দ্রিক নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি প্রচারের প্রতি গুরুত্বারোপ করিয়াছেন। বিশেষ করিয়া, ইমাম-মুয়াজ্জিনরা প্রতি ওয়াক্ত নামাজের সময় মসজিদের মাইক হইতে মাস্ক পরা, কিছুক্ষণ পরপর হাত ধোয়া, অপরিষ্কার হাত দিয়া নাক, মুখ ও চক্ষু স্পর্শ না করা, সকল কাজে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি বিষয় প্রচার করিতে পারেন। জুমার নামাজের পূর্বে বা পরে সংক্ষিপ্ত বয়ানেও বিষয়টি নিয়মিত তুলিয়া ধরা যাইতে পারে। অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয় হইতেও একইভাবে প্রচার-প্রচারণার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা যাইতে পারে।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় গত রবিবার আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরের মেয়র আবার লকডাউনের বিধিনিষেধ জারি করিয়াছেন। ইউরোপসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহও রহিয়াছে ঝুঁকির তালিকায়। এই জন্য প্রচারণার ব্যাপারে ব্যাপক প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। শুধু বাংলাদেশ নহে, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় ব্যক্তিগণ এখনো শ্রদ্ধার পাত্র হিসাবে বিবেচিত। এমনকি এক ধর্মের অনুসারীরা অন্য ধর্মের পণ্ডিতদেরও সমীহ করিয়া থাকেন। সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং যে কোনো জাতীয় দুর্যোগ হইতে জাতিকে রক্ষায় এই ধর্মবেত্তাদের বাণী তৃণমূলের সাধারণ জনগণ অত্যন্ত মনোযোগ দিয়া শুনিয়া থাকেন এবং মান্য করেন। এই জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এই ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সামনের দিনগুলিতে প্রচারণার এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও মাধ্যমের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা অত্যাবশ্যক। এই জন্য এই সকল আলেম-ওলামা, পুরোহিত-পণ্ডিতদের বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
