নারী ও নিরাপত্তা—শব্দ দুটি যেন আমাদের সমাজে ক্রমশ বিপরীতমুখী শব্দ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে চলেছে। ছোটবেলার গল্পছলে মায়ের মুখের কল্পিত রাক্ষস যেন আজ বাস্তবে পরিণত হয়েছে। তবে গল্পের মতো একজন রাক্ষস নয়। ঘরে-বাইরে রাস্তাঘাটে সব জায়গায় বিভিন্ন রুপী রাক্ষসদের আনাগোনা। গল্প ও বাস্তবের রাক্ষসের পার্থক্য এটাই যে গল্পের রাক্ষস আহারাভাবে রক্ত পানের জন্য যে কোনো মানুষ মারত আর বাস্তবের রাক্ষস শুধু নারীকে সুযোগমতো ধরে যৌন ক্ষুধা মেটানোর পর অমানুষিক নির্যাতন শেষে হত্যা করে।
আমাদের একদিন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হবে এটা সবারই জানা। কিন্তু এই মৃত্যু যখন স্বাভাবিক নিয়মে না হয়ে নির্মম ও পাশবিকভাবে হয় সেই মৃত্যুগুলোকে আমি এবং আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। যখন শুনি শিশু তার আপনজন কর্তৃক ধর্ষিত হয় তখন আমার সহজ সরল মায়াভরা আপনজনের চেহারাই চোখের সামনে আসে আর আমি লজ্জায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। যখন শুনি কোনো বৃদ্ধ তার নাতনি বয়সিকে ধর্ষণ করেছে তখন আমি বাগ্রুদ্ধ হয়ে যাই। যখন শুনি রাস্তার পাগলিটা মা হয়েছে কিন্তু বাবা হয়নি কেউ তখন চিত্কার করে কাঁদতে চেয়েও করতে পারিনি চিত্কার। যখন শুনি প্রতিবন্ধী ও ৭২ বছরের বৃদ্ধাকে ধর্ষণ করা হয়েছে তখন মনে হয় এ দেশে এখনো কেন বেঁচে আছি? আর স্বামী দ্বারা অহরহ নির্যাতনকে তো আমরা মুখ বুজে মেনেই নিয়েছি। নারী নিরাপদ নয় ঘরে, নারী নিরাপদ নয় বাইরেও। তাহলে নারীর জায়গা আসলে কোথায়? নারী কোথায় গিয়ে বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে পারবে? এই সমাজ আমাদের প্রতিনিয়ত উঠতে বসতে বুঝিয়ে দিচ্ছে নারী হয়ে জন্মানোই যেন আজন্ম পাপ। নারীর আবার নিরাপত্তা হতে পারে এই ভাবনা ভেবে কেউ তার জীবনের সময় নষ্ট করতে রাজি নয়। বরং নারীকে ভোগ্যপণ্য ভেবে কীভাবে কুিসত আনন্দ পাওয়া যায় তাই অনেকের একমাত্র ভাব্য। একজন নারীকে জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিনিয়ত ভাবতে হয় তার নিরাপত্তার কথা। তাকে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়। এতশত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে নারীর বেঁচে থাকাটাই হুমকিস্বরূপ। যেদেশে সামান্য নারীদের নিরাপত্তাটুকু নেই সে দেশে নারীর ক্ষমতায়ন কতটা যুক্তিযুক্ত।
সাম্প্রতিক নোয়াখালীর এক গৃহবধূর ওপর নির্যাতনের ভিডিও প্রকাশ হয়েছে। পুরুষ নারীর ওপর কতটা পাশবিক হতে পারে ভিডিওটি দেখলেই বোঝা যায়। ভিডিওটি দেখে এমন কোনো মানুষ নেই যার হূদয় কাঁপেনি। নির্মমতা কতদূর হলে এই জাতি হবে নির্লজ্জ? আমাদের সাধারণ মানুষের হূদয় এবং বিচার ব্যবস্থায় যারা কর্মরত আছেন তাদের হূদয়ের অনুভূতি কি আলাদা? প্রতিনিয়ত ধর্ষণের খবর শুনে তাদের হূদয়ে এসব বিষয়গুলো কি কখনোই নাড়া দেয় না? এসব হূদয়বিদারক ঘটনা কি তাদের ঘরের মা-বোনদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবায় না।
আজ হয়তো খবরের কাগজে দেখছি এসব ঘটনা কাল ভুলে যাব। কিন্তু পড়শুদিন যে সেই পত্রিকায় আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নৃশংসতার খবর ছাপবে না তার কতটুকু নিশ্চয়তা আছে? তাই সময় থাকতেই আওয়াজ তুলুন। আওয়াজ তুলুন ঘরে, আওয়াজ তুলুন বাইরে। আপনার পরিবারে ভাই, ছেলে, স্বামীর নারীর প্রতি কেমন শ্রদ্ধাশীল সেই দিকটিতে খেয়াল রাখুন। ভালো খারাপ দিক বিবেচনা করে সঠিক ব্যবস্থা নিন।
প্রত্যেকের জায়গা থেকে যেভাবে সম্ভব ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। নানা সামাজিক কারণে পুরুষের যে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে তা সহসাই দূর হবে না। ফলে প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ঘৃণা না ছড়িয়ে নিজের পরিবার থেকেই সংগ্রাম শুরু করুন। কারণ যে দেশে ধর্ষকের পক্ষে উকিল পাওয়া যায় সেদেশে ধর্ষণ পুরোপুরি নির্মূল হওয়া আদৌ কি সম্ভব? পুরুষ জাতির একটা শ্রেণির কথা এতক্ষণ উল্লেখ করা হয়েছে, তারা বিকৃত মস্তিষ্কের দ্বারা পরিচালিত হয়ে দৈহিক শক্তিকে পুঁজি করে পৃথিবীটাকে নরক বানিয়ে নিজেদের পরিচিত করেছে ধর্ষক হিসেবে। এর বাইরে আর যে শ্রেণিটি রয়েছে তারা সব বৈধ শক্তি থাকা সত্ত্বেও নারীর প্রতি সকল প্রকার অত্যাচার, নির্যাতনের পাশে দাঁড়িয়েছেন বা দাঁড়ান। আমাদের সমাজে এখনো অনেক পুরুষ আছে যারা রাস্তাঘাটে, বাড়িতে, কর্মস্থলে নিজেদের জায়গা ছেড়ে দেয় নারীদের সুবিধার জন্য। তাই গুটিকয়েক নর্দমার কীটের সঙ্গে নিজের নিষ্ঠাবান বাবার তুলনা করে নিজেকে লজ্জিত করবেন না। নিজেদের ভিত নিজেদেরই মজবুত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে হলেও নারীদের মানসিকভাবে আরো দৃঢ় হওয়ার সংকল্পবদ্ধ হতে হবে। রাস্তায়, বাড়িতে বা কর্মস্থলে কেউ যাতে আপনার মাধ্যমে কোনো ফায়দা লুটে না নিতে পারে সেই জায়গাটি নিজেই তৈরি করুন। যে কোনো অন্যায়কে বাড়তে না দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করুন। নারী নয়, নিজেকে একজন মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করুন এবং নিজের নিরাপত্তা নিজেই আদায় করে নিতে শিখুন।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
