করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে পুরো বিশ্ব এখন ভ্যাকসিনের (টিকা) প্রতীক্ষায়। সবার আগে রাশিয়া ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ঘোষণা দিলেও সেটি নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। করোনা ভাইরাস সংকট উতরানোর কয়েকটি মূল উপায়ের মধ্যে ভ্যাকসিন একটি। তবে মনে রাখতে হবে, কোভিড-১৯-এর সফল টিকার আবিষ্কার কিন্তু মহৌষধ নয়। কেননা, এর মধ্যে ‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের’ আশঙ্কা বাড়ছে। এর অর্থ যখন একটি দেশ তাদের জনগণের জন্য ভ্যাকসিন প্রস্তুত হওয়ার আগেই তার সরবরাহকে নিশ্চিত করে রাখে। সরকার ও সম্ভাব্য প্রস্তুতকারকের মধ্যে প্রাক-ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে এটা সম্পন্ন হয়। কোভিড-১৯ প্রতিরোধে সক্ষম ভ্যাকসিন বাজারে আসার আগেই তা অগ্রিম ক্রয় করা শুরু করেছে ধনী দেশগুলো। এ পরিস্থিতি ২০০৯ সালের এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রাদুর্ভাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন ধনী দেশগুলো বেশির ভাগ ভ্যাকসিন সরবরাহের দখল নিয়েছিল। তাই ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ নতুন কিছু নয়। একটি ভ্যাকসিন তৈরি, পরীক্ষা ও ব্যাপক হারে উত্পাদন করার প্রতিটি পদক্ষেপ বিশাল চ্যালেঞ্জ। পরবর্তী বিতরণকে ঘিরে রাজনৈতিক ও নৈতিক সিদ্ধান্তগুলো আরেক চ্যালেঞ্জ। এটি জন্ম দিয়েছে নতুন উদ্বেগ ও শঙ্কা। প্রশ্ন হচ্ছে, টিকা সবাই পাবে কি না?
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের ভ্যাকসিন ক্রয় দরিদ্র ও উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য তৈরি করেছে এক প্রবল ঝুঁকি। বিবিসির তথ্যমতে, আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ছয়টি কোম্পানি থেকে ভ্যাকসিনের ৮০০ মিলিয়ন ডোজ নিশ্চিত করেছে, সঙ্গে প্রায় ১ বিলিয়নের বেশি কেনার অপশনও আছে। ফাইজার ইংক এবং বায়োএনটেক এসই—নামের দুটি বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে এ বাবদ ১৯৫ কোটি মার্কিন ডলারের প্রতিষেধক কেনার চুক্তি করা হয়। দ্য গার্ডিয়ান বলছে, মাথাপিছু হিসাবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্রেতা হচ্ছে যুক্তরাজ্য, যারা কিনছে ৩৪০ মিলিয়ন ডোজ। যেখানে প্রতিজন নাগরিকের জন্য তারা প্রায় পাঁচটি করে ডোজ কিনছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যারা কি না গোষ্ঠীবদ্ধভাবে ভ্যাকসিন কিনছে এবং জাপানও নিজেদের জন্য প্রায় ১০০ মিলিয়ন ভ্যাকসিন ডোজ নিশ্চিত করেছে। তাই, ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের ফল ভালো হবে ভয়াবহ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আডানোম গেব্রিয়াসিস বলেছেন, ভ্যাকসিন নিয়ে জাতীয়তাবাদী আচরণ করা হলে তা করোনা মহামারি মোকাবিলার পথে বাধা তৈরি করবে। এদিকে গত ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সর্তক করে বলেন, ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ শুধু অন্যায়ই নয়, এটি আত্মবিনাশীও বটে। উন্নত বিশ্ব যখন একের পর এক ক্রয়চুক্তি করেই চলেছে, তখন দরিদ্র দেশগুলো তাদের প্রয়োজনমাফিক ভ্যাকসিন চালান আদৌ পাবে কি না, তা নিয়েই দেখা দিয়েছে সংশয়। অক্সফামের রিপোর্ট অনুযায়ী, ধনী দেশগুলো সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের উত্পাদন সক্ষমতার ৫১ শতাংশই কিনে ফেলেছে। কিন্তু ওই দেশগুলোতে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষের বসবাস। ধনী দেশের এই কাড়াকাড়ির কারণে আবিষ্কারে এগিয়ে থাকা পাঁচটি ভ্যাকসিনও যদি সফল হয় তবু ২০২২ সালের আগে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬১ শতাংশ মানুষ ভ্যাকসিন নিতে পারবে না। করোনার ভ্যাকসিনের জন্য অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটির দিকে তাকিয়ে আছে। শেষ পর্যন্ত ১৫৬টি দেশ কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটিতে ভ্যাকসিন সহযোগিতায় অংশীদার হয়েছে। কিন্তু এ কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটি কতটা সফল হবে তা নিয়ে সংশয় আছে। প্রথমত, এখানে সমতা আনাটা খুব কঠিন হবে। কারণ, চীন ও আমেরিকার মতো গ্রেটেস্ট ইকোনমির অনুপস্থিতি। দ্বিতীয়ত, নিম্ন-আয়ের দেশগুলো কীভাবে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং এর বিতরণটা এসব দেশের জন্য আরো জটিল হবে। বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল Bill and Melinda Gates Foundation, Global Fund, CEPI, কিংবা GAVI-র মতো সংস্থা, যারা গরিব ও নিম্ন-আয়ের দেশগুলোয় টিকা সরবরাহে কাজ করছে। গ্যাভি কর্মসূচির অংশ হিসেবে মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ বিনা মূল্যে ভ্যাকসিন পাবে। তবে সফলতা নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ ও শঙ্কা। গত জুনে দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে বলা হয়, জাতীয়তাবাদ বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যনীতির নিরিখে খুবই বিব্রতকর ব্যাপার। যদিও এমন প্রাক-ক্রয় চুক্তি আটকানোর জন্য কোনো আন্তর্জাতিক নীতিমালাও নেই। ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ সব মানুষের ভ্যাকসিন পাওয়ার ন্যায়সঙ্গত অধিকারকে খর্ব করবে। সবচেয়ে তাত্ক্ষণিক প্রভাবটা পড়বে অনুন্নত দেশগুলোর ওপর।
বিশ্ব যদি দ্রুত এ ভাইরাস থেকে মুক্ত হতে চায়, তবে একত্রিতভাবে কাজ করতে হবে। কারণ, এটি বিশ্বায়নের দুনিয়া। এখানকার অর্থনীতি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের একাংশ কিংবা গুটিকয়েক দেশ একা একা নিজেদের ভাইরাস থেকে মুক্ত রাখতে পারবে না। মারাত্মক এ রোগটির অস্তিত্ব যদি কোথাও থেকে যায়, তবে সব জায়গার মানুষের জীবনযাপনই ঝুঁকিতে পড়বে। করোনা ভাইরাসের টিকা ক্রয় ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। কিন্তু, ভাইরাস কখনো ধনী ও গরিব দেশ দেখে ছড়ায় না।
n লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
