ভয়ঙ্কর রূপে রোহিঙ্গারা, স্থানীয়রা চরম আতংকে

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তিন দিনে ৭ খুন  

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২০, ২২:৪৬

উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গারা দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত তাদের সংঘর্ষের কারণে স্থানীয়রা চরম আতংকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ইয়াবা ও ক্যাম্প ভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষের কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাতে দুই বাংলাদেশি গাড়ি চালকসহ গত তিন দিনে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৭ জন খুন হয়েছে। এই ঘটনায় শতাধিক রোহিঙ্গা আহত হয়েছে। বর্তমানে ক্যাম্পের ভেতরে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র মতে, উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি জমিতে ৩৪টি ক্যাম্পে রয়েছে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। আশ্রয় নেওয়ার পর এক বছর রোহিঙ্গারা নীরব থাকলেও যত দিন যাচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অপরাধ বাড়ছে। স্থানীয় মাদক ও ইয়াবা কারবারি এবং চোরাচালান কারবারিদের সঙ্গেও তাদের অবাধ যাতায়াত। আর ক্যাম্পগুলোকে মাদক, ইয়াবা, অস্ত্রের মজুত বানিয়ে ফেলেছে। অপরাধের মাত্রা বেড়ে এখন রোহিঙ্গাদের মধ্যেই প্রায় প্রতি রাতে ক্যাম্পে সংঘর্ষ চলে। অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ, অপহরণ, বিশেষ ক্ষমতা আইন, পুলিশ আক্রমণ, ডাকাতি, হত্যা, মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত রয়েছে রোহিঙ্গারা। ক্যাম্পের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা দোকানপাট থেকে চাঁদা আদায়, মিয়ানমার থেকে নিয়ে আসা ইয়াবা ও নানা প্রকার মাদক ও অস্ত্র বাণিজ্য, সংগঠনভিত্তিক এলাকা দখল নিয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত চলছে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা।

পুলিশের তথ্যমতে, গত তিন দিনে ৭ জন খুন হয়েছে। এর মধ্যে গত ৪ অক্টোবর দুজন, ৫ অক্টোবর একজন ও ৬ অক্টোবর দুই স্থানীয়সহ চারজন নিহত হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দু’গ্রুপের মধ্যে এখনও উত্তেজনা চলছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ থাকায় ক্যাম্পের পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ ঘটনায় কক্সবাজার র‌্যাব-১৫ টেকনাফের চাকমারকুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৯ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ আটক করেছে। 

এছাড়া গত ২০১৭ সালে নানা অপরাধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল ৭৬টি, আর আসামি হয় ১৫৯ জন। ২০১৮ সালে ২০৮ মামলায় আসামি হয়েছে ৪১৪ জন। ২০১৯ সালে মামলার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৬৩টি আর আসামি হয় ৬৪৯ জন। চলতি বছরের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গা অপরাধীদের বিরুদ্ধে হওয়া ১৮৪ মামলায় আসামি হয় ৪৪৯ জন।

একাধিক রোহিঙ্গা জানান, কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আনাস গ্রুপ ও মুন্না গ্রুপের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এরই জের ধরে কুতুপালং ২ ওয়েস্ট ডি-ব্লকে ৪ অক্টোবর রাতে মুন্না গ্রুপের ১০/১২ শত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী দা-লাঠি নিয়ে ক্যাম্পের শতাধিক ঝুপড়ি ঘর ও ৬০/৭০টি দোকান ভাঙচুর করেছে।

এ ঘটনায় আনাস-মাহাদ গ্রুপ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং মুন্না গ্রুপের ওপর চড়াও হয়। এভাবে গত সপ্তাহ জুড়ে বিক্ষিপ্তভাবে সংঘর্ষ চলে আসছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দু’গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া পাল্টাধাওয়া, গোলাগুলির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে প্রাণ বাঁচাতে কয়েকশ’ সাধারণ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু কুতুপালং ক্যাম্প ছেড়ে অন্য ক্যাম্পে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে দোকানপাট বন্ধ রয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ও উখিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা ইয়াবার চালানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব নয়। ক্যাম্পে কয়েকটি গ্রুপ মাদক, অপহরণ, খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, নারী ও শিশু পাচারের সঙ্গে জড়িত। তারা মিয়ানমার থেকে সরাসরি ইয়াবা চালান এনে ক্যাম্পে মজুত রাখে। ক্যাম্পে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়ির মধ্যেও রোহিঙ্গারা ইয়াবা চালান, মজুত এবং লেনদেন করে। 

কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রফিকুল ইসলাম জানান, উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র নতুন ও পুরাতন রোহিঙ্গাদের মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকে সংঘর্ষের ঘটনায় ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

তাদের মধ্যে তিনজন গুলিবিদ্ধ ও একজনকে গলাকাটা অবস্থায় পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে দুজন স্থানীয় গাড়িচালক রয়েছে। ওই ক্যাম্পে বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সংঘর্ষ থেমে গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।

কক্সবাজারের ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (পুলিশ সুপার) হেমায়েতুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন কোনও না কোনও ক্যাম্প থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। তবে ক্যাম্পে অপরাধপ্রবণতা বাড়লেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলমান উত্তেজনা, সংঘর্ষের ঘটনার কথা উল্লেখ করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ প্রত্যাবাসন কার্যালয়ে অতিরিক্ত কমিশনার সামশুদ্দোহা নয়ন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বর্তমানে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও এপিবিএন সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। তবে ক্যাম্পের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

ইত্তেফাক/এমএএম