অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল
যুগে যুগে মানসিক স্বাস্থ্য ছিল অবহেলিত। এখনো মানুষ ডুবে আছে কুসংস্কার, অন্ধত্ব আর ভুল বিশ্বাসে। এখনো মানসিক স্বাস্থ্য অবহেলিত রয়ে গেছে। তবে দিনে দিনে এর গুরুত্ব আলো ছড়াচ্ছে জনসাধারণ ও প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে। রাজনীতির মাঠেও এখন মনের স্বাস্থ্য নিয়ে কথাবার্তা হয়, আলোচনা হয়। মানবমনের প্রত্যক্ষণ, আবেগ, চিন্তন, অন্তর্গত প্রেষণা, মেমোরি, শিক্ষণ, কগনিশন— এসব মনের স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষদ। যাপিত জীবন, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র তো বটেই, করোনাকালে মানুষ দেখার সুযোগ পেয়েছে মনের এ অনুষদগুলো। কীভাবে সমস্যার জালে জড়িয়ে যায়, কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কী কষ্ট আর দহনজ্বালা নিয়ে দিন পার করতে হয়—এসব বুঝেশুনে বিশ্বনেতৃবৃন্দ এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে মনের স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার ডাক দিয়েছেন।
সর্বস্তরে মানসিক সেবাকে পৌঁছে দিতে হবে—এটি এক গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান। এর মধ্যে রয়েছে মানুষের জন্য স্বাস্থ্যবিষয়ক পলিসি নির্ধারণ, তার কর্মকৌশল নির্ধারণ এবং কর্মকৌশল বাস্তবায়ন করা। জনগণের দোরগোড়ায় মানসিক সেবাগুলো পৌঁছানো ও আরো উন্নত করার জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর ডাক এসেছে। একই সঙ্গে ডাক এসেছে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর। এর পেছনে লুকিয়ে থাকা কুসংস্কার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে বাধা হিসেবে কাজ করে।
কুসংস্কার দূর করতে হবে এবং সর্বস্তরে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হবে। শিশু মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জরুরি একটি বিষয়। বয়স্ক মানুষের সেবাও যুগে যুগে উপেক্ষিত থেকেছে অজ্ঞতার কারণে। আর তাই সর্বস্তরের মানুষের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার আহ্বান জানানো হয়েছে প্রত্যেকটি দেশকে। এখানে উল্লেখ করা যায়, প্রাসঙ্গিকও, আমাদের দেশে বর্তমান সরকার মানুষের দোরগোড়ায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক সেবার অন্তর্ভুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মানসিক সেবায় রয়েছে বিরাট ‘ট্রিটমেন্ট গ্যাপ’। আক্রান্ত ভুক্তভোগীর সংখ্যা এবং চিকিত্সা গ্রহণের হার অনেক কম। বাংলাদেশে এই হার প্রায় ৯৪ শতাংশ। এই গ্যাপ পূরণের তাগিদ এসেছে। এছাড়া রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যারা জড়িত, সবার মধ্যে মেলবন্ধন গড়ে তোলার আহ্বান। পেশাজীবীদের সম্মিলিত প্রয়াস মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে উন্নত করতে পারে এবং এ কারণে সেবাপ্রদানের ফ্যাসিলিটিগুলোর দিকে নজর দিতে হবে।
জটিল মানসিক রোগীদের চিকিত্সাসেবা প্রদানের জন্য সাংগঠনিক ভিত্তিতে কাজের গতি প্রসারিত করতে হবে এবং রিসোর্স আহরণের ব্যবস্থা করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড-১৯ চিকিত্সা ব্যবস্থায় সব ক্ষেত্রে—শহর-বন্দর-গ্রাম সমব্যবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এরপর পোস্ট কোভিড রোগ বেড়ে যেতে পারে। তার মোকাবিলায় অর্থ বরাদ্দ, পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণের দিকে নজর দিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ম্যানপাওয়ার বা পেশাজীবীদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
দুই
Theme of the day:
Mental health for all. Greater investment Greater access. Everyone, Everywhere— সময়োপযোগী এ প্রতিপাদ্য মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। প্রশাসনকে এ বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। কর্মীদের চ্যালেঞ্জের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য উদ্বুদ্ধ হতে হবে। সবার চেষ্টায় মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ের অজ্ঞতাকে দূর করা সম্ভব, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব।
বিশ্ব জুড়ে কোভিড-১৯-এর কারণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। মানুষের মনকে বোঝা, মনের সমস্যাকে ধরা এবং গুরুত্ব দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
কয়েকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ :
প্রথমত, যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের প্রতি থাকতে হবে আমাদের সহমর্মিতা, তাদের পরিবারের প্রতিও নজর দিতে হবে, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার নলেজ বা সাধারণ জ্ঞান মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। এ বিষয়টি মেন্টাল হেলথের সমস্যা ও রোগ বিষয়ে আলোকিত করবে সমাজকে।
দ্বিতীয়ত, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, মুখোমুখি যোগাযোগ, একজনের প্রতি আরেক জনের মমত্ববোধ, মানবিক বোধ বোঝাপড়া বাড়িয়ে দেবে। একজনের জন্য আরেক জনের চিন্তা করা খুবই জরুরি। মানসিক সুস্থতায় ফিরে আসার জন্য বিশেষ করে যারা ভুগছে, তাদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা জরুরি।
তৃতীয়ত, আমরা বিশ্বাস করি আমাদের নজর দিতে হবে কমিউনিটিগুলোর দিকে। সমাজের একজন হিসেবে দায়িত্ব একজন মানসিক সমস্যা-আক্রান্ত রোগীর পাশে দাঁড়ানো। যারা কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছেন তাদের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা, ভয় দূর করার জন্য সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। এটা একধরনের বিনিয়োগও। এ বিনিয়োগের দিকেও নজর দিতে হবে। শুধু অর্থের বিনিয়োগ বড় কথা নয়, মানবিক বিনিয়োগ আরো ব্যাপকভাবে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য প্রয়োজন। নোবেল করোনা ভাইরাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, কতটুকু অবহেলিত ছিল মানসিক স্বাস্থ্য। এই দেখানো পথটা যেন আমরা ভুলে না যাই—নিউ নরমাল জীবনযাপনে বিশ্ব জুড়ে যে মহামারি চলছে, সে মহামারির মধ্যে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে, মানিয়ে নিতে হবে এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। এভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করা সম্ভব।
১০ অক্টোবর ১৯৯২ সালে প্রথম বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালন শুরু করা হয়। এর উদ্যোক্তা হচ্ছে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ—উদ্দেশ্য ছিল মানসিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন, অ্যাডভোকেসি এবং জনগণকে এ বিষয়ে সচেতন করা। আর এ বছর আমরা স্পটলাইট হিসেবে দেখছি, করোনা ভাইরাস আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, কেন মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। এটা ভুলে গেলে চলবে না বিশ্বে বিশাল এক জনগোষ্ঠী ডিপ্রেশন আর অ্যাংজাইটি নিয়ে বাস করছে।
আমরা জানি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, মেন্টাল, নিউরোলজিক্যাল সাবস্ট্যান্স ইউজ ডিসঅর্ডার আমাদের অর্থনীতির ওপরে বিশাল চাপ তৈরি করছে; প্রায় ১৩ শতাংশ গ্লোবাল বার্ডেন হিসেবে দায়ী। প্রতি চার জনের একজন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবুও বিশ্ব জুড়ে ট্রিটমেন্ট গ্যাপ ৫০ শতাংশ উন্নত দেশগুলোতে এবং লো-মিডল আয়ের দেশগুলোতে ৫০ শতাংশ। ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে উন্নত করে ট্রিটমেন্ট গ্যাপ কমাতে হবে।
তিন
করোনা ভাইরাস থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে কিছু নিয়মকানুন পালন করতে হবে : বাসায় থাকতে হবে। বাসার বাইরে যেতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। ‘নলেজ ইজ পাওয়ার’ কথাটা তখনই কার্যকর হবে যখন আমরা এটাকে ব্যবহার করব। সতর্ক হতে হবে এ বিষয়টাতে। আমরা লক্ষ করছি বৃহত্তর জনগণ একেবারেই রিলাক্স হয়ে গেছে, তারা ভাবছেন করোনা ভাইরাস আমাদের দেশ ছেড়ে চলে গেছে। করোনা চলে গেলে অবশ্যই আমরা খুশি হব। কিন্তু এখনো রিলাক্স হওয়ার সময় আসেনি। এখনো অসতর্ক থাকার সময় আসেনি।
মহামারির দ্বিতীয় ওয়েব আসার সম্ভাবনা এখনো বিশেষজ্ঞরা উড়িয়ে দেননি। এখনো উন্নত দেশগুলোতে দ্বিতীয় ধাপের সংক্রমণের হার লক্ষ করা যাচ্ছে। সুতরাং আমরা অগ্রিম সতর্কতা পালন করব। সম্ভাব্য দ্বিতীয় মহামারি প্রতিরোধে এটাই দেশবাসীর প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় আহ্বান।
মাথায় রাখতে হবে, করোনা সংক্রমিত হলে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। করোনা আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষ সুস্থ হয়ে যায়। সুতরাং জ্বর এসেছে, শুকনো কাশি হচ্ছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, কিংবা যদি মনে হয় শ্বাস নিতে পারছি না, খুব টায়ার্ড লাগছে, ক্লান্ত অবসাদ লাগছে, শরীরে একটা অস্বস্তিকর অবস্থা, ব্যথা ব্যথা লাগে সতর্ক হয়ে যেতে হবে। এবং স্বাস্থ্যবিধিগুলো আমরা মেনে চলব। প্রয়োজনে হাসপাতালে যাব, টেলিমেডিসিন চিকিত্সাসেবা গ্রহণ করব। আমরা লক্ষ করছি, করোনার কারণে মানসিক সমস্যার মহামারি শুরু হয়েছে। বিশ্ব জুড়ে মানসিক সমস্যার জন্য সতর্ক থাকতে বলেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাসচিব।
আক্রান্ত হওয়ার ভয়, পরিবারের স্বজন হারানো কষ্ট, শোক; বন্ধুবান্ধব হারানোর ভয় মিলে আমাদের ভেতরে মারাত্মকভাবে মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। এ চাপ শরীরের অন্যান্য রোগ বাড়িয়ে দেবে। এই চাপ রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেবে। পরবর্তী সময়ে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার প্রতিরোধের জন্য সতর্ক হতে হবে। চাপমুক্ত থাকার জন্য চেষ্টা করতে হবে। যারা মহামারির সময় আক্রান্ত হয়েছেন তাদের সাইকোটিক ডিজঅর্ডারের হার বেড়ে যে গেছে। চার ভাগের এক ভাগের মধ্যে দেখা যাচ্ছে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার। ১৬ শতাংশের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে বিষণ্নতা রোগ। সুতরাং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
সাউথ আফ্রিকায় এক গবেষণায় দেখা গেছে, লকডাউনের সময় ৪৬ শতাংশ অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে এবং ৪০ শতাংশ ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয়েছে, ৩০ শতাংশ পরিবারের মধ্যে গুরুতর জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং ১২ শতাংশ আত্মহত্যার চিন্তা করছে। সুতরাং কোভিড-উত্তর সময়ে যাতে মানসিক রোগগুলো স্থায়ী আসন গেড়ে বসতে না পারে, তার জন্য এখন থেকেই সতর্ক হতে হবে। এ বিশ্ব মহামারি সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্যের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে—প্রতিটি দেশ এবং প্রতিটি সরকারকে প্রত্যেক মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে। এটি এবারের সবচেয়ে বড় স্লোগান।
করোনাকালে বিধ্বংসী সময়ে আমরা লক্ষ করছি, দেশে ধর্ষণের হার বেড়ে গেছে। অনেকে মনে করেন, এসব বোধ হয় মানসিক সমস্যা। না, ধর্ষণ মানসিক রোগ নয়। ধর্ষণ অপরাধ। ধর্ষক অপরাধী। এভাবেই দেখতে হবে। তাকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। দ্রুত বিচার শেষ করার উদ্যোগ নিতে হবে। অপরাধী শাস্তি না পেলে অপরাধ বাড়তে থাকবে। তাদের এই অপরাধকে মানসিক রোগ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা রোধ করতে হবে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।
n লেখক :মনঃশিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক, শব্দঘর
