সাধন সরকার
গণমাধ্যম-সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সর্বত্রই ধর্ষণকাণ্ডের লোমহর্ষক সব কাহিনি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে কোনোখানেই নারী নিরাপদ নয়। এটা শুধু বিচারহীনতার সংস্কৃতি নয়, মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ও। ‘আসকে’র তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম ৯ মাসে ২৯৭ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, চলতি বছরের একই সময়ে এটি বেড়ে ৪৩২ হয়েছে। গত ৯ মাসে সারা দেশে ৯৭৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, ধর্ষণের পর ৪৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। শিশুও নির্যাতন থেকে বাদ যায়নি! কয়টা ঘটনাই বা গণমাধ্যমে আসে! রাষ্ট্র কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। নারীরা যখন নিজেদের অধিকারের কথা বলছে, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন হচ্ছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই নারীর প্রতি আঘাত নেমে আসছে। অনেকে লাজ-লজ্জার ভয়ে নীরবতা ভাঙতে সাহস পাচ্ছেন না। দেখা যাচ্ছে, কোনো ঘটনায় হইচই পড়ে যাওয়ার পরই কেবল কর্তৃপক্ষের টনক নড়ছে।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও পেশিশক্তির ব্যবহার বেড়েই চলেছে! বখাটে ও ধর্ষকেরা প্রভাব খাটিয়ে সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে! এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সেই পশুদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু শাস্তি নিশ্চিত করলেই নারী নির্যাতন কমে যাবে এমনটি নয়! এক্ষেত্রে মূল্যবোধ জাগাতে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনও দৃঢ় করতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে সামাজিক অনুশাসন ও মূল্যবোধ। ধর্ষক ও নির্যাতনকারীদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। সচেতন মানুষ যদি রুখে দাঁড়ায়, রাষ্ট্র যদি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করে—তাহলে এই অপরাধের ব্যাপকতা অনেক কমবে। অনেক সময় দেখা যায়, নির্যাতনকারী গ্রেফতার হয়েও কোনো না কোনোভাবে বেরিয়ে আসে। অসহায় নারীর পাশে তখন কেউ থাকে না। নির্যাতনকারীর অর্থের প্রভাব, চতুরতা, ক্ষমতার জোর, রাজনৈতিক প্রভাব ইত্যাদির কাছে সবই যেন মূল্যহীন! এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে পুরুষ এটা মনে রাখে, কোনো ধরনের নারী নির্যাতন বা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার রেহাই নেই। তরুণ সমাজ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রত্যেক সচেতন মানুষ, অধিকার আদায়ের বিভিন্ন গ্রুপ, প্রশাসন যদি তত্পর থাকে তাহলে নির্যাতনকারী কোনোভাবেই পার পেতে পারে না।
নারীদের সুরক্ষায় অনেক ব্যবস্থা আছে বটে, কিন্তু সত্যি বলতে পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজে জোর খাটানোর মানসিকতা এখনো বদলায়নি। নারী নির্যাতন করে কোনোভাবেই পার পাওয়া যাবে না—এ নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে দিতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, নির্যাতিত হওয়ার পরও বিচার চাইতে এসে অসহায় ঐ নারীকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। প্রশাসনকে নির্যাতিত নারীকে তাত্ক্ষণিক সুরক্ষা দিতে হবে। এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। সবার হাতে হাতে মোবাইলফোন। নারী নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটলে যে কোনো সময় জরুরি সেবা—৯৯৯, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ—১০৯ নম্বরসহ আরো অনেকভাবে ফোন করে তাত্ক্ষণিক সেবা পাওয়া যাচ্ছে। তাই নির্যাতনকারীদের রুখে দেওয়ার এখনই সময়। নারীদের রক্ষায় সর্বত্র একটা জাগরণ তৈরি করতে হবে। নির্যাতন ও ধর্ষণের ক্ষেত্রে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করার বিকল্প কিছু হতে পারে না।
ঢাকা
