করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কর্মক্ষেত্র চালু করা হলেও অন্য সবকিছু বন্ধ রাখা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ভালো পন্থা। কিন্তু প্রতিদিনের পরিচিত জীবনযাপনের নির্দিষ্ট ছক পালটে যাওয়ায় মানসিক সমস্যায় ভুগছেন অনেকেই। একদিকে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্ক। অন্যদিকে চাকরি, ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চাপ। সব মিলিয়ে মানসিক চাপে ভুগছেন প্রতিটি মানুষ। এতটা সময় ঘরবন্দি থাকার প্রভাব পড়েছে শিশুদের মনে, শরীরে। খেলাধুলা তো বন্ধই, স্কুলে গেলে বন্ধুদের সঙ্গে যেটুকু দেখা হতো সেটাও একেবারেই বন্ধ। ঘরে থাকতে থাকতে তারা অস্থির, অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা যে কবে কাটবে তার উত্তর তো জানা নেই কারোই।
আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য— সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ বলছে, করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বের প্রায় ৯৩ শতাংশ দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত অথবা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের ১৩০টি দেশে জরিপ চালিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর এমন বিধ্বংসী প্রভাব পাওয়া গেছে। করোনা ভাইরাস মহামারির আগে বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
করোনা মহামারির কারণে যে মানসিক চাপ তা আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার। সবার মনে একটাই প্রশ্ন, এই দম বন্ধ অবস্থা কবে কাটবে। যেভাবে উদ্বেগ, একাকিত্ব, অবসাদের প্রকোপ বাড়ছে, তাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছে। গৃহবন্দি অবস্থায় আতঙ্কে মানুষের প্রতিরোধ ভেঙে গেলে কি হবে তাদের অবস্থা। একটি রাষ্ট্র কীভাবে সামলাবে সেই মনোরোগীর চাপ!
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের বিজ্ঞানীরাও এ নিয়ে আশঙ্কা জানিয়েছেন। সম্প্রতি, ‘ইমারজিং ইনফেকসাশ ডিজিজ’ নামে এক নিবন্ধে তারা জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ মনের জোরে এই বিপদ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন, বাকিরা কিন্তু তা একেবারেই পারছেন না। এই নিবন্ধে বলা হয়েছে, অহেতুক ভেবে মাথা খারাপ করে কোনো লাভ নেই। বেশি ভাবলে মানসিক অশান্তি বাড়বে। আতঙ্কিত হলে তার প্রভাব পড়বে পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতি। মানসিক চাপ বাড়লে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে।
আমাদের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড হসপিটালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এম মোহিত কামাল বলেন, এই করোনাকালে তারাই ভালো রয়েছেন যারা করোনা মানসিক চাপ মেনে নিতে পেরেছেন। অনেকে ভয় পেলেও ভয়কে জয় করেছেন। কেউ কেউ ভয়ে কাবু হয়েছেন। অনেকেই কাজ স্বাভাবিকভাবে করতে পেরেছেন। আবার অনেকের সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে। অনেকের চাকরি বা ব্যবসায় সমস্যা হয়েছে। সময়টাকে মেনে নিয়ে সেই অনুযায়ী নিজের পরবর্তী কর্মপন্থা ঠিক করতে হবে।
ধানমন্ডির বাসিন্দা মিথুন হাসান বললেন, অফিস যাই আর আসি। ঘরে, অফিসে যেখানেই থাকি না কেন সব সময় একটা মানসিক চাপের মধ্যে আছি। প্রতিদিন করোনায় মৃত্যুর খবর, আক্রান্তের খবর মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে।
ঘরে বসে থাকা আর ভালো লাগছে না ছেলের বাসায় থাকা লিয়াকত আলীর। তিনি বললেন, আমি তো ঘরে থেকেই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। সন্ধ্যায় পাড়ার মসজিদে নামাজ পড়ে অনেকের সঙ্গে আড্ডা দিতাম। এখন সব বন্ধ। ঘুমানো, খাওয়া আর টিভি দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।
এ প্রসঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কথাসাহিত্যিক ডা. মোহিত কামাল বলেন, বাড়িতে থাকলেও প্রবীণদের সামাজিক যোগাযোগটা বজায় রেখে চলতে হবে। আর তা করতে হবে টেলিফোনে, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে। আর টেলিভিশনে খবরটার ওপর নিয়মিত নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে সরকারি ঘোষণা বা বিজ্ঞপ্তি সম্পর্কে। যাতে বাইরের জগতের সঙ্গে তারা আপডেটেড থাকতে পারেন। তবে টেলিভিশনে মৃত্যু বা দুঃখ, শোকের খবর থেকে নিজেদের যদি তারা দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন, তা হলে সেটাই সবচেয়ে ভালো। তার বদলে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, মন ভালো করা টিভি সিরিয়াল বা পুরোনো দিনের সিনেমা দেখতে পারেন। শুনতে পারেন পুরোনো দিনের আনন্দের গান। বাড়িতে নিয়মিত ব্যায়ামও করতে পারেন। এছাড়া, নাতি-ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ইনডোর গেম খেলে সময় কাটান। কোনোভাবেই একা একা তাদের থাকতে দেওয়া যাবে না।
