দর নির্ধারণেও অস্থিরতা কমেনি চালের বাজারে। উলটো দাম আরো বেড়েছে। তাহলে চালের দর নির্ধারণ করে দিয়ে লাভ কী? কাদের স্বার্থে দর নির্ধারণ করে দেওয়া হলো। এই প্রশ্ন এখন ক্রেতাদের? চলতি বছরে কয়েক দফা বেড়েছে চালের দাম। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার আরো এক দফা বেড়েছে চালের দাম। গত ২৯ সেপ্টেম্বর খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার মিলমালিক, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরাদের সঙ্গে বৈঠক করে চালের দর বেঁধে দেওয়ার পর গত ১০ দিনেই দুই দফা বেড়েছে চালের দাম।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, একটি চক্র চালের বাজারে কারসাজি করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। খাদ্যমন্ত্রী নিজেও বারবার এই চক্রের কথা বলেছেন। কিন্তু এই চক্রকে সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। এই চক্রকে খুঁজে বের করলেই চালের বাজার স্থিতিশীল হবে।
গতকাল রাজধানীর খুচরাবাজারে সরু চাল নাজিরশাইল/মিনিকেট ২ টাকা বেড়ে ৫৬ থেকে ৬২ টাকা, মাঝারি মানের চাল পাইজাম/লতা ৩ থেকে ৫ টাকা বেড়ে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা ও মোটা চাল ইরি/স্বর্ণা কেজিতে ৪ টাকা বেড়ে ৪৮ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ খাদ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মিলমালিকদের বৈঠকে মোকামে প্রতি কেজি সরু মিনিকেট চাল ৫১ টাকা ৫০ পয়সা ও মাঝারি মানের চাল পাইজাম/লতা সর্বোচ্চ প্রতি কেজি ৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ভোক্তাদের জিজ্ঞাসা, যদি মিলগেটে এই দরে চাল বিক্রি করা হয়। তাহলে খুচরাবাজারে পাইজাম/লতা চালের দাম ৫৫ টাকা হয় কী করে?কৃষি বিপণন অধিদপ্তর জানিয়েছে, মিলগেটে প্রতি কেজিতে নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত ২ টাকা বাড়িয়ে পাইকারি এবং পাইকারি পর্যায় থেকে প্রতি কেজিতে আরো আড়াই টাকা বাড়িয়ে খুচরা পর্যায়ে বিক্রির জন্য দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ হিসাবে পাইকারি বাজারে ভালো মানের মিনিকেট বিক্রি হবে প্রতি কেজি ৫৩ টাকা ৫০ পয়সা। আর খুচরা ব্যবসায়ীরা তা বিক্রি করবেন সর্বোচ্চ ৫৬ টাকা কেজি। একইভাবে পাইকারি বাজারে মাঝারি মানের মিনিকেট বিক্রি হবে ৪৭ টাকা কেজিতে, যা খুচরা ব্যবসায়ীরা বিক্রি করবেন সর্বোচ্চ প্রতি কেজি ৪৯ টাকা ৫০ পয়সা। অথচ সরকার নির্ধারিত মাঝারি মানের চালের দামে মোটা চালও পাওয়া যাচ্ছে না।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের চান্দাইকোনার মেসার্স অন্তিম সেমি অটো রাইস মিলের মালিক মো. গোলাম মোস্তফা শেখ, তালুকদার সেমি অটো রাইস মিলের মালিক মিলন তালুকদার এবং ফাইভস্টার সেমি অটো রাইস মিলের মালিক সোহেল রানা খোকন জানান, সরকার চালের দাম বেঁধে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চালের দাম একলাফে বেড়ে গেছে। তারা জানান, প্রতি কেজি মোটা চাল ছিল ৪০ থেকে ৪১ টাকা। কাটারিভোগ মিনিকেট ছিল যথাক্রমে ৪২ থেকে ৪৪ টাকা। এখন কেজিতে এসব চাল ৪ থেকে ৫ টাকা বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বলেন, পাইকার ও আড়তদাররা আমাদের কাছ থেকে সরকারনির্ধারিত দরে চাল কিনছেন না। তারা তাদের মজুতকৃত চালই বেশি দরে বিক্রি করছেন। ফলে চালের দাম কমছে না। মিলারদের কাছ থেকে সরকারনির্ধারিত দরে চাল কিনলে তো বাজারে চালের দাম এত হওয়ার কথা না। তবে আড়তদাররা অভিযোগ করেছেন, মিলাররা সরকারনির্ধারিত দরে চাল বিক্রি করছেন না।
এদিকে চালের দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ। রাজধানীর কাওরানবাজারে প্রায় ১০ বছর ধরে ভ্যান চালান আমিনুল। তিনি বলেন, আমাদের তো আয় বাড়েনি। বরং করোনার জন্য আয়-রোজগার আগের চেয়ে কমে গেছে। এ অবস্থায় চালের দাম বাড়ায় সমস্যায় পড়েছি। সমস্যার কথা জানালেন, রায়গঞ্জের চান্দাইকোনা বাজারে নিত্য ভোগ্যপণ্য কিনতে আসা সিমলা গ্রামের দিন মজুর আবদুস সাত্তার শেখ। তিনি বলেন, সংসারে পোষ্য বেশি চাল লাগে বেশি। দাম খুব বেশি হওয়ায় চাল কিনতেই সব টাকা ফুরিয়ে গেছে। একই কষ্টের কথা জানালেন, দরিদ্র ভোক্তা চান্দাইকোনা বাজারের পার্শ্ববর্তী বাদাম চানাচুর বিক্রেতা নারায়ণ চন্দ্র দেব, একই এলাকার ভ্যানচালক সনি শেখ ও চকসাত্রা গ্রামের নবাব আলী। তাদের সবার একই কথা, চাল কিনতেই সব টাকা ফুরিয়ে যায়। অন্য সওদা কিনব কীভাবে?
