‘আমিতো কখনো ভাবিনি যে আমার শেষ জীবন এতো সুন্দর ঘরে থাকবো। আগে ছিলাম রাস্তার ধারে প্লাস্টিকের চাল ও বস্তা দিয়ে ঘেরা ঘরে। এখন পেয়েছি রঙিন টিনের বাড়ি-ঘর। শেখ সাইবের বেটি, হামার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রঙিন টিনের বাড়ি-ঘর করে দিয়েছেন।’
চোখে মুখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে সাংবাদিকদের রংপুরের ভাসায় কথা গুলো বলেন পঁয়ষট্টি বছরের বৃদ্ধা সমন্ত বানু। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের কামারপাড়া গুচ্ছগ্রামে থাকেন সমস্ত বানু। আগে থাকতেন উপজেলার মিস্ত্রিপাড়া গ্রামে। ভূমি ও গৃহহীন এই বৃদ্ধা একমুঠো ভাতের জন্য এলাকার আশপাশের হাটবাজারে ভিক্ষা করতেন। মাথা গোঁজবার জায়গা না থাকায় পলিথিনের ছাউনি দিয়ে রাস্তার ধারে ঠাঁই নিয়েছিলেন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায় (সিভিআরপি) প্রকল্পের আওতায় সয়ারের কামারপাড়ায় নির্মাণ করা গুচ্ছগ্রামে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে তাকে একটি ঘর দেন ইউএনও আমিনুল ইসলাম। এখন সেই ঘরে থাকছেন স্বামী হারা সমস্ত বানু। তার মতো আরও ৩০ পরিবারের জীবন জীবিকার ঠাঁই হয়েছে গুচ্ছগ্রামে।
রবিবার দুপুরে কামারপাড়া গুচ্ছগ্রামে সরেজমিন গেলে চোখে পড়ে, সারি করে সাজানো রঙিন টিনের ঘর। প্রতিটি ঘরের পেছনে রয়েছে উন্নতমানের শৌচাগার। সূর্যাস্তের পর আলো ছড়াতে রয়েছে সৌর বিদ্যুতের ঝলকানি। এসব দেখে মনে হবে, এ যেন পরিপাটি সাজানো একটি গ্রাম।
তারাগঞ্জে আরেকটি গুচ্ছগ্রাম গড়ে উঠেছে হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের উজিয়ালে। কামারপাড়া গুচ্ছগ্রাম হতে এর দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। উজিয়াল গুচ্ছগ্রামে আশ্রয় হয়েছে আরও ৩৫টি অসহায় ভূমিহীন পরিবারের। সেখানে গিয়ে কথা হয়, ফজিলা বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, তার স্বামী কপিল উদ্দিন ২০ বছর আগে মারা গেছেন। ছেলেহীন সংসারে দুই মেয়ে থাকলেও তারা নিজেরাই অসহায়। দুবেলা ঠিক মতো খাবার জোগাতে পারে না। অন্যের বাড়িতে কাজ করে অতিকষ্টে তার জীবন চলছিল। ভিটেমাটি না থাকায় বড় মেয়ের বাড়িতেই কষ্টে থাকতেন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায় (সিভিআরপি) প্রকল্পের আওতায় নতুন ঠিকানা হওয়াতে খুব খুশি এই বৃদ্ধা। হাসতে হাসতে বলেন, ‘এ্যালা নয়া ঘরোত মুই শান্তিতে ঘুম পারোং বাহে।’ আগের মতো কষ্ট নাই। প্রধানমন্ত্রীকে আল্লাহ ভালো রাখুক। হামার মতো গরিবের জন্য সরকার অনেক কিছু করছে।’
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায় (সিভিআরপি) প্রকল্পের অধীনে দুটি গুচ্ছগ্রামে ৬৫টি ঘর, বারান্দা, রান্নাঘর, নলকূপ ও শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৯৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ২২৫ মেট্রিক টন চাল। গুচ্ছগ্রাম দুটিতে রয়েছে সৌর-বিদ্যুৎ সুবিধার ব্যবস্থা। আনুষ্ঠানিকভাবে কামারপাড়া ও উজিয়াল গুচ্ছগ্রাম এখনো উদ্বোধন হয়নি। তবে সেখানে ইতিমধ্যে ৬৫টি পরিবার বসবাস শুরু করেছে। সরকারের এই প্রকল্পে অসহায় ভূমিহীন মানুষের জীবন বদলে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয় সয়ার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আজম। তিনি জানান, ‘গুচ্ছগ্রাম দুটিতে আশ্রয় পাওয়া সবাই ভূমিহীন দিনমজুর, ভিক্ষুক। তাদের ঘর বানিয়ে থাকার মতো সামর্থ্য ছিল না। ঘর পেয়ে এই হত-দরিদ্র মানুষেরা বেজায় খুশি।
তারাগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আব্দুল মমিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ভূমিহীন অসহায় দরিদ্র মানুষের ভাগ্য বদলে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তারই প্রতিফলন এসব গুচ্ছগ্রাম। দুটি গুচ্ছগ্রামে যারা ঘর পেয়েছেন, তারা হত-দরিদ্র, ভূমিহীন ও ভিক্ষুক। এখন তাদের মুখের হাসি সবাইকে মুগ্ধ করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে।
ইত্তেফাক/ইউবি
