দীপ্ত রিজন
নিধি আর আমার বিয়ের বয়স প্রায় সাড়ে তিন বছর। সেদিন অফিস থেকে ফিরে জামা-কাপড় না পালটেই রাতে যখন খেতে বসলাম, নিধি হুট করেই বলল, এই তোমার আর আমার বিয়ের কাহিনিটা খুব অদ্ভুত তাই না!
আমি সেই কাহিনি মনে করে হাসতে হাসতে বিষম খেলাম।
অফিস থেকে বের হতে হতে রাত হয়ে গিয়েছিল। বাস থেকে কাওরানবাজার মোড়ে নেমেই রিকশা নিয়ে গন্তব্য পান্থপথ, আমার মেসে। রিকশা থেকে খুব দ্রুত নেমে ভাড়া মিটিয়ে মেসের দিকে একরকম দৌড়ই দিলাম। বিপত্তিটা তখনই টের পাই।
ভাড়া দেয়ার সময় পকেট থেকে আমার পেনড্রাইভটা পড়ে গেছে। সেখানে আমার সিভিটা রেডি করা ছিল। অফিস পলিটিক্সে বিরক্ত হয়ে অন্য একটা কোম্পানিতে সিভি দেব বলে মনস্থির করেছিলাম। সিভিটার কোনো ব্যাকাপও নিয়ে রাখা হয়নি। কী আর করা। যা গেছে তো গেছে খামোখা মন খারাপ করে কী হবে।
দুইদিন পর একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলো।
—হ্যালো, আপনি কি রিজওয়ান সাহেব বলছেন? আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি ইখতিয়ার মাহমুদ, আমার এক্সপোর্ট-ইম্পোর্টের ব্যবসা আছে, তাছাড়া টুকটাক গার্মেন্টসের সঙ্গেও জড়িত।
—আচ্ছা, আমার কাছে আপনার কী প্রয়োজন?
—আপনার সম্ভবত একটা পেনড্রাইভ হারিয়েছে, রাইট? আপনার পেনড্রাইভটা আমার কাছে। সেদিন রাতে আমার ড্রাইভার রাস্তার পাশে কুড়িয়ে পেয়ে আমাকে এনে দিল। পেনড্রাইভেই আপনার সিভিটা দেখলাম, সেখান থেকেই টেলিফোন নম্বরটা পেলাম। আপনার প্রোফাইল তো বেশ ইম্প্রেসিভ!
—অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
—আপনি কি এখন কোথাও কাজ করছেন?
—জি, একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে অ্যাডমিন ম্যানেজার হিসেবে আছি।
—আপনার যে কোয়ালিফিকেশন আর একাডেমিক রেজাল্ট তাতে তো আপনি আরো অনেক ভালো কিছু ডিজার্ভ করেন। তো একদিন সময় করে আমার অফিসে আসুন। চা খেয়ে যান আর আপনার পেনড্রাইভটাও নিয়ে যাবেন।
এভাবেই আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। ইখতিয়ার মাহমুদ সেনাবাহিনীতে ছিলেন। রিটায়ারমেন্টের পর বিজনেস শুরু করেন। বড় ব্যবসায়ী হওয়া সত্ত্বেও ইখতিয়ার সাহেব বেশ অমায়িক এবং সদালাপী মানুষ। কথায় কথায় তিনি আমাকে তাঁর প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে বলেন—শোনেন রিজওয়ান সাহেব, আপনার যে যোগ্যতা তাতে আপনাকে এত ছোটখাটো চাকরিতে মানায় না। আপনি আমার এখানে চলে আসুন। আপনার যোগ্যতা অনুযায়ীই আপনাকে মূল্যায়ন করা হবে।
দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে গেল। আমি নিজেও আমার চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাইছিলাম।
নতুন অফিসে যোগ দেয়ার তিন মাসের মাথায় আমি দ্বিতীয়বারের মতো পেনড্রাইভ হারালাম। বেমালুম ভুলে গেলাম পেনড্রাইভের কথা।
বেশ কয়েক মাস পর একটা মেইল পেলাম। সেই মেইলে জনৈক তরুণী দেখা করতে চেয়েছেন। কোনো এক ছুটির দিনে একটা রেস্টুরেন্টে দেখা হলো তাঁর সঙ্গে। তরুণীটি ইখতিয়ার সাহেবের সম্পর্কে ভাগ্নি। অফিসে তিনি আমার পেনড্রাইভটি খুঁজে পান। সেটি ফেরত দিতেই মিট করা।
ইখতিয়ার সাহেবের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় উনি নিজেই একসময় সেই ভাগ্নির সঙ্গে আমার বিয়ের প্রস্তাব করেন। পরিবারের সম্মতিতেই আমাদের বিয়ে হয়।
এইসব কাহিনি মনে করতে করতে হঠাত্ খেয়াল করলাম আমার প্যান্টের পকেটে পেনড্রাইভটা নেই! অফিস থেকে বের হওয়ার সময়েও মনে করে পেনড্রাইভটা নিয়েছিলাম।
এবার কী ঘটে কে জানে!
অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য
