নতুন আইন প্রণয়নে স্বস্তি আসবে কি

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২০, ২১:৩০

অজিত মনি দাস

জঘন্যতম অপরাধ ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ বাঙালি সংস্কৃতির কাঁটা হয়ে ভয়াল রূপ নিয়েছে বাংলাদেশে, কিন্তু কেন? খবরের কাগজ খুললে, টিভিতে খবর দেখতে বসলে কিংবা ফেসবুকে ঢুকলেও যেন  চারিদিকে শুধু ধর্ষণের খবর। কোথাও গণধর্ষণের কথা শুনতে পাওয়া যায়, কোথাও বা ধর্ষণের পর নরপিশাচরূপী ধর্ষক তাকে মেরে ফেলে গেছে এ খবরও শুনতে পাওয়া যায়। এত নিষ্ঠুর বর্বরতার কারণ কি? ধর্ষণের জন্য আমাদের এই চুপ করে থাকা সমাজ দায়ী, প্রতিবাদী না হয়ে চুপ করে থাকা কিছু নারীসমাজ দায়ী,  চুপ করে থাকা প্রশাসন দায়ী, আস্কারা দেওয়া পুলিশ দায়ী। এছাড়াও ধর্ষকের চিন্তাধারায় আরো দুটি কারণ হতে পারে। ১) ধর্ষক জানে তার কোনো শাস্তি হবে না বা বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের এমন কোনো শাস্তি হয়নি আদৌ এবং ২) না হয় ধর্ষক কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বড় হচ্ছে এবং অসত্ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে, যেখানে প্রশাসন তার হাতের মুঠোয় এই ভ্রান্ত ধারণা সে মনে মনে বিশ্বাস করে। এ দুটো বিকৃত চিন্তাধারাই ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ ঘটাতে যথেষ্ট। ধর্ষক মন থেকে রাজনীতি করে না, রাজনীতিতে প্রবেশ করে ক্ষমতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার জন্য।

বর্তমান আওয়ামী সরকার দেশের উন্নয়নে নিজেদের সফলতা ও দক্ষতা দেখিয়েছে, বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে উন্নয়নশীল ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে। জাতিসংঘসহ শান্তিরক্ষা মিশনের বাংলাদেশ গৌরবময় অধ্যায় রচনা করেছে। কিন্তু ধর্ষণ রোধে সরকারের ভূমিকা কতটুকু ছিল, তা নিয়ে জনমানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকার ধর্ষণকে কোনোভাবেই সমর্থন করে না বরং ধর্ষকের শাস্তি চায়, তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্য নেতাকর্মীদের ভাষণে স্পষ্ট। কিন্তু সরকার কেন এখনো ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারছে না, তা নিয়ে সমালোচনার ঢেউ বয়ে যাচ্ছে সারা দেশ জুড়ে। যার প্রেক্ষাপটে, কয়েক দিন ধরে সারা দেশে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন লাখো শিক্ষার্থী। এ আন্দোলনটি আরো বেগবান হয়েছে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে গৃহবধূর শ্লীলতাহানিকে কেন্দ্র করে। ধর্ষণ এতটাই মহামারি আকার ধারণ করেছে যে, নারীদের নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে গোটা দেশে।

ধর্ষক কোনো ধর্মের হতে পারে না, কিংবা বাঙালি হওয়ার কোনো যোগ্যতা রাখে না। যে বাঙালি তার তাজা রক্তের বিনিময়ে রাজপথ রঞ্জিত করেছে মাতৃভাষার জন্য, যে বাঙালি নিজের প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে শুধু লাখো মা-বোনের ইজ্জত বাঁচাতে, নারীর ওপর নির্যাতনের অবসান ঘটাতে। সেই বাঙালি আজ নিজেদের স্বাধীন দেশে ধর্ষণের মতো অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে? না আমরা সেই ধর্ষক নামধারী কুসন্তানদের বাঙালি আখ্যা দিয়ে বাঙালি শব্দটাকে অপবিত্র করতে চাই না। এরা সমাজের শত্রু, দশের শত্রু, দেশের শত্রু। এই নরপিশাচরূপী ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি একটাই—মৃত্যুদণ্ড, যা কার্যকর করতে যাচ্ছে সরকার। এই উদ্যোগে সরকার প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু সর্বনিম্ন শাস্তিও কঠোর হওয়া উচিত। যা কার্যকর হওয়া উচিত ছিল জনসম্মুখে। যা দেখে আর কোনো ধর্ষক মাথানাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না, ধর্ষকের শাস্তির কথা চিন্তা করলেও সকলের বুক কেঁপে উঠবে। ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডকে মাথায় রেখেই আইন প্রণয়ন করছে সরকার। আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছে সর্বস্তরের মানুষ। এর সঙ্গে  ধর্ষণের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন কঠোর শাস্তি নিয়ে আইন প্রণয়ন দ্রুত কার্যকর চায় জনগণ। সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ তাদের মা-বোনের নিরাপত্তার জন্য রাজপথে নেমেছে, আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, এ বাংলার মাটিতে কোনো অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলনই ছিল একমাত্র পথ। আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে মাতৃভাষা পেয়েছি, আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা পেয়েছি। আজ স্বাধীন বাংলাদেশেও ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবির জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে। আমি এ প্রতিবাদী মনোভাব শিক্ষার্থী সমাজকে সাধুবাদ জানাই। শিক্ষার্থীরা মুখে কালো কাপড় বেঁধে ধর্ষণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রতিবাদ করেছে। সেই শিক্ষার্থীরা মনেপ্রাণে যেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকেই লালন করে। স্বাধীনতার জন্য যারা পবিত্র তাজা প্রাণ দিয়েছে, সেই স্বাধীন রাষ্ট্রকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে প্রয়োজনে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারে তাও স্পষ্ট। বহু ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনের গাফিলতির কারণে ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত না করায় বেড়েছে ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও শিশু ধর্ষণ। ফলে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সরকারের ভাবমূর্তি টিকিয়ে রাখতে সরকারকেই দ্রুত কার্যকর আরো উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কথায় আছে, ‘সরষের মধ্যেই ভূত’। সেই সরষে থেকেই ভূত তাড়াতে হবে সরকারকে। ধর্ষণ রোধে নতুন আইন দ্রুত কার্যকর করতে হবে এবং ধর্ষণের ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ধর্ষককে আইনের আওতায় এনে কঠোরতম শাস্তি থেকে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়