ফারহান ইশরাক
মানুষই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে পরিগণিত হয়। হাজার হাজার বছর ধরে এই গ্রহে মানুষের বাস। একক সত্তার মানুষ নিজেরা গড়ে তুলেছে সংঘবদ্ধ সমাজ, দেশ, আইন, প্রচলিত বিধিনিষেধ আরো কত কী! এ সবই ছিল সময়ের প্রয়োজনে মানুষের জীবনকে আরো বেশি স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলতে। প্রাচীনকালের মানুষ বৈরী প্রকৃতির মাধ্যমে দলগতভাবে বাস করত। যার ফলে একটি দল বা গোত্রের মানুষের মধ্যে কোনো ধরনের বৈষম্য বা ভেদাভেদ ছিল না। কেউ অনাহারে থাকছে, আর কেউ পেটপুরে খাচ্ছে এমন সংস্কৃতি তখনো চালু হয়নি। কিন্তু এর পরে বছরের পর বছর ধরে সভ্যতার ক্রমপরিবর্তন ঘটতে থাকে। এই পরিবর্তন মানুষকে যেমন স্বাভাবিক জীবনে শান্তি এনে দিয়েছিল, তেমনিভাবে মানুষে মানুষে ব্যবধান আর বৈষম্য তৈরিরও সুযোগ করে দিয়েছিল। এই ধারা থেকেই এক সময় একই সমাজের মানুষের মধ্যে শ্রেণি বিভেদ তৈরি হতে লাগল। সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে ধনী-দরিদ্র, উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত নামের শ্রেণি তৈরি হলো। পুঁজিবাদীদের তুমুল ভোগবিলাসী মানসিকতায় অভাবীদের অভাব বাড়ল আরো শতগুণে। তখন থেকেই সমাজব্যবস্থায় চলমান এই অসাম্যের ধারা শুরু। পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে আমরা জন্মলাভ করেছি। মনুষ্যচোখেই আমাদেরকে অন্য মানুষের বর্ণনাতীত দুঃখ, কষ্ট, শোষণ, বঞ্চনার নিদর্শন দেখতে হয়, সহ্য করতে হয় নিষ্ঠুর বর্বরতা। এখনো আমাদের সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রেণির দুর্ভোগ, দুর্দশা আকাশছোঁয়া। মানুষের এই দুর্ভোগের জন্যও কিন্তু মানুষই দায়ী।
বৈষম্য, শোষণ, বঞ্চনা, দুঃখ, দুর্ভোগ, দুর্দশার পাশাপাশি যুদ্ধ, বিগ্রহ, হানাহানিও মানুষে মানুষে ব্যবধান তৈরি করে আসছে সৃষ্টির শুরু থেকে। এই যুদ্ধ কখনো হয়েছে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে, কখনো সবল দ্বারা দুর্বলকে আক্রমণ করতে, আবার কখনো-বা পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের কারণে। সংঘাতের পটভূমি যা-ই থাকুক না কেন, যুদ্ধ, বিগ্রহ কখনো মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। বরং নিয়ে আসে অসহনীয় মানবিক বিপর্যয়। যুগের পর যুগ ধরে যুদ্ধ, সংঘাতের ভয়াবহতা দেখার পরও মানুষে মানুষে হানাহানি কমেনি, বরং সময়ের ব্যবধানে কৌশল আর প্রযুক্তির উত্কর্ষে যুদ্ধের নৃশংসতা বেড়েছে, অসংখ্য মানুষের মৃত্যু, ঘরবাড়ি, সম্পদহানি মানুষকে অসহায় করেছে।
মূলত মানুষের মধ্যে বৈষম্য, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের আপ্রাণ প্রচেষ্টা, সবলের গৌরব, অহমিকা-ই মানুষে মানুষে সংঘাত, হানাহানি, ভেদাভেদের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এই ক্ষেত্র এক দিনে তৈরি হয়নি, হাজার হাজার বছর ধরে নানা পরিক্রমার মধ্য দিয়ে এই অবস্থানে এসেছে আজকের মানবসমাজ। তাই এই চলমান ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে গেলেও দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। হয়তো গুণগত পরিবর্তন আসতে কয়েক প্রজন্ম লেগে যাবে। কিন্তু সময়ের কথা ভেবে যদি পিছপা হওয়া যায়, তবে কখনোই আর সৃষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধান আসবে না। এর জন্য এখন থেকেই পরিবর্তনের সূচনা, নতুন আগামীর ডাক দিতে হবে। সমাজের বিদ্যমান কুসংস্কার, মিথ্যা বিশ্বাসকে উপড়ে ফেলা দরকার। মানবসমাজের মূল সমস্যাগুলোকে খুঁজে বের করতে গেলে সমাজের গভীরে প্রবেশ করতে হবে। তারপর সেই সমস্যাগুলো ধরে ধরে তার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে ভাবতে হবে। মানবসভ্যতার সামগ্রিক কল্যাণ সাধন করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।
মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য সবার প্রথম প্রয়োজন পারস্পরিক সৌহার্দ। এই সমাজ, এই দেশ, এই রাষ্ট্র, এই পৃথিবীর সব মানুষ যাতে একে অপরকে সম্মান করে, একের প্রতি অন্যের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। অর্থনৈতিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে নয়, মানুষকে মাপতে হবে মনুষ্যত্বের মানদণ্ডে। সব ধর্ম, সব বিশ্বাস, মতাদর্শ, চিন্তার মানুষকে সমানচোখে দেখতে হবে। সবাইকে সমান ভাবার এই যে দৃষ্টিভঙ্গি, এটি তৈরিতে কিছুটা সময় লাগবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি স্কুল, কলেজ কিংবা বই পড়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা। সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্যায় হিসেবে এটি-ই সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে হেটস্পিচ বা বিদ্বেষমূলক বাণী ছড়ানো বন্ধ করা প্রয়োজন।
একটি সুখী পৃথিবী গড়ে তুলতে হলে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা প্রয়োজন। মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করতে হবে, এর জন্য সমাজের সবাইকে সমান চোখে দেখার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। এর মাধ্যমেই তৈরি হবে একটি সৌহার্দপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা যার স্বপ্ন আমরা দেখে আসছি দীর্ঘ সময় ধরে, যে বিশ্বব্যবস্থায় মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না, লোপ পাবে সকল প্রকার শ্রেণি বৈষম্য।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
