সানজানা হোসেন অন্তরা
দেশমাতৃকার সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দিব কোথা? সেই ব্যথা হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি আজ সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন; কিন্তু সোনার মানুষ কি আমরা পেলাম! অভাগা এ জাতি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি, তার নীতি-আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ গড়তে প্রায় সবাই উঠেপড়ে লেগেছে।
দুর্নীতিবাজরা দেশ ও জাতির শত্রু। দুর্নীতিবাজদের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে না অনেকেই। সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে ঢুকে পড়েছে দুর্নীতি। মুক্তিযুদ্ধের সনদ পর্যন্ত চুরি করে নামের আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা বসাতেও সামান্য বুক কাঁপে না। কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার নামও শোনা যায় অনেক রাঘব বোয়ালদের। করোনা বাংলাদেশের অন্যান্য খাতের ন্যায় স্বাস্থ্য খাতের চেহারাও খুলে দিয়েছে জনসাধারণের নাম। দেখিয়ে দিয়েছে এই খাতটি কতটা দুর্বল। দুর্নীতিতে জড়িয়ে অনেক স্বনামধন্য ডাক্তার, নার্স। ভুয়া করোনা রিপোর্ট দেওয়া থেকে শুরু করে ব্যবহূত মাস্ক, গ্লাভস আবারও ধুয়ে বিক্রি—এসব চিত্র সবকিছুকেই হার মানায়। অনেক ভুয়া চিকিত্সকের ভুল চিকিত্সার কারণে কত প্রাণ যে ঝরে যাচ্ছে তার হিসাব কে রাখে। বিশ্লেষকেরা বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বরাদ্দ ৮০ শতাংশই দুর্নীতিবাজদের পেটে চলে যায়।
সমাজে ধর্ষণ, সন্ত্রাস, নির্যাতন— হাজারো অপরাধ সংঘটিত হলেও হচ্ছে না সুষ্ঠু শাস্তি, কমছে না অপরাধ। একইভাবে দুর্নীতিবাজরাও রাজনৈতিক দলগুলোকে ছাতা হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের সুরক্ষিত করছে। ঘটনার তদন্তে দেখা যায়, বড় কোনো দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কোনো না কোনো বড় রাজনৈতিক নেতাকর্মীর যোগসূত্র আছে।
দুর্নীতির ফলে রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে অবক্ষয় বা পচন শুরু হয় এবং রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসনসহ কোনো ক্ষেত্রেই সার্বিকভাবে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয় না। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনি ইশতেহারে দলনেত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবুও কমেনি দুর্নীতি, থেমে নেই দুর্নীতিবাজরা।
দুর্নীতিবাজদের আশ্রয়দাতা হিসেবে যেন কোনো রাজনৈতিক নেতা না থাকে তা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শুদ্ধাচার ব্যতিরেকে দুর্নীতির কার্যকর প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। তাই দুর্নীতিবাজ সে যেই হোক তার অপরাধের জন্য তার উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ করে কেউ রেহাই পাবে না—এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর জন্য দরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করা। অপরাধীর প্রতি কোনো স্বজনপ্রীতি অনুভব না করে, আইনের চোখে সবাই সমান—এই ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তবে যে কোনো অপরাধ সংঘটিত হবার আগেই তার প্রতিরোধ বেশি কার্যকরী। এজন্য দরকার ব্যক্তির নিজ ও পারিবারিক উদ্যোগ। নিজেকে ও পরিবারের সদস্যদের সত্ ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নিজের বিবেকের কাছে যে কোনো কাজ করার আগে প্রশ্ন করা উচিত, ভাবা উচিত কাজটা কতটুকু নৈতিক। দুর্নীতি রুখতে আত্মোপলব্ধির চেয়ে বড় কোনো অস্ত্র আর হয় না। নিজের ও সরকারের যৌথ সহয়তায় যেভাবেই হোক দুর্নীতির ছোবল থেকে দেশকে রক্ষা করা একান্ত জরুরি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার অবাস্তবায়িত স্বপ্নটি যেন আমাদের হাত ধরেই বাস্তব রূপ লাভ করে—সেজন্য নিজেদের সত্যিকারের মনুষ্যত্বসম্পন্ন মানুষ হয়ে দুর্নীতি রুখতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
